রোহিঙ্গা শরণার্থী ও বাংলাদেশ মায়ানমার সম্পর্ক

বাংলাদেশকে প্রথম দিকে স্বীকৃতি দানকারী ও প্রতিবেশী দেশ হিসেবে স্বাভাবিক ভাবেই মায়ানমারের সাথে বাংলাদেশের উষ্ণ সম্পর্ক গড়ে ওঠার কথা ছিল। কিন্তু নিজ নিজ দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা ও কিছু দ্বৈত সমস্যা বিদ্যমান থাকার পরিপ্রেক্ষিতে তা আর হয়ে ওঠেনি। যদিও বাংলাদেশের পূর্বমুখী পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে মায়ানমার একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। দ্বৈত সমস্যাগুলোর একটি হচ্ছে রোহিঙ্গা শরণার্থী সমস্যা। শরণার্থী শব্দটি যদিও আমাদের স্বাধীনতার সাথে জড়িত, ১৯৭১ সালে হানাদার বাহিনীর অত্যাচার থেকে বাঁচার জন্য প্রায় ১ কোটি বাংলাদেশি ভারতে আশ্রয় নেয়। ১৯৫১ সালে গৃহীত জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক কনভেনশনে বলা হয়েছে যে, “শরণার্থী হচ্ছে এমন এক মানুষ যে তার বর্ণ, ধর্ম, জাতীয়তার ভিন্নতার কারণে কিংবা নির্দিষ্ট কোন সামাজিক গোষ্ঠীর সদস্য হওয়ার কারণে নিজ দেশে নিপীড়নের ভয়ে ভীত সন্ত্রস্ত থাকে এবং পরবর্তীতে অন্য একটি দেশে আশ্রয় নেয়।” সংজ্ঞাগত দিক থেকে “রোহিঙ্গা শরণার্থীরা” ঠিক থাকলে এদের কিছু বৈশিষ্ট্যের কারণে আজ তারা আমাদের ভাবনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশে মায়ানমার থেকে শরণার্থী আগমন শুরু হয় ১৯৭৮ সালের এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহ থেকে (মায়ানমারের জেনারেল নে উইনের শাসনকাল ১৯৬২-১৯৮৮ ছিল রোহিঙ্গাদের জন্য সবচেয়ে শোচনীয় অধ্যায়)। ১৯৭৮ এর শেষের দিকে এ সংখ্যা দাঁড়ায় ১ লাখ ৬৭ হাজার। সংকটের কারণ অনুসন্ধান জানা যায় মায়ানমার সরকার কর্তৃক পরিচালিত “ঙঢ়বৎধঃরড়হ উৎধমড়হ” (মায়ানমারের ভাষায় ‘নাগামিন’)’র ফলে বিশেষত আরাকানের মুসলমানরা বিভিন্ন প্রকার নির্যাতনের সম্মুখীন হয়। এরা বাংলাদেশসহ বিভিন্ন মুসলিম রাষ্ট্রে যেমন- সৌদি আরব, কুয়েত, পাকিস্তান, আফগানিস্তানে আশ্রয় নেয়। তারই অংশ হিসেবে তারা বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের কক্সবাজার ও পার্বত্য চট্টগ্রামে নিঃস্ব অবস্থায় আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। এদের অধিকাংশই ছিল আকিয়াব (সিটওয়ে) পালেটরা, মিনবিয়া, মায়োহং, মাইনব, মংডু এবং রাথেডং প্রভৃতি অঞ্চলের অধিবাসী।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতিসত্তার দেশ হিসাবে মায়ানমার ১৩৭টি জাতির মধ্যে ১৩৬টি জাতিকে স্বীকৃতি দিলেও একটি জাতি তথা রোহিঙ্গাকে মায়ানমার সরকার জাতি হিসাবে স্বীকৃতি দেয়নি। ১৯৮২ সালে গৃহীত মায়ানমারের নাগরিকত্ব আইনের সরকারি ঘোষণায় আনুষ্ঠানিকভাবে রোহিঙ্গাদের নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়। যেখানে তারা ‘গরবা’ বা মেহমান বলেই পরিচিতি। এ ব্যাপারে মায়ানমার সরকারের ভাষ্য হল রোহিঙ্গারা মায়ানমারের নয়; বরং তারা আরবীয় মুসলমান এবং বাংলাদেশি মুসলমানের বংশোদ্ভূত। তাই মায়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের প্রতি এমন কিছু নীতিমালা প্রণয়ন করছে, যার ফলে প্রতিনিয়ত সেখানে মানবাধিকার বা মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন হচ্ছে। সেসব নীতিমালায় রয়েছে কোন রোহিঙ্গা পরিবারে কেউ জন্ম গ্রহণ, বিয়ে এবং মৃত্যু বরণ করলে সরকারকে কর দিতে হবে। জমির ফসলের অর্ধেক সরকারকে দিতে হবে। রোহিঙ্গা ছাত্র-ছাত্রীরা উচ্চ শিক্ষা (দশম শ্রেণীর উপরে) নিতে পারবে না। বিনা পারিশ্রমিকে সরকারী কনস্ট্রাকশন প্রোজেক্টে কাজ করতে হবে। এছাড়া তাদের গৃহপালিত পশু পাখি, গাছের ফল কিংবা জমির ফসল নির্দ্বিধায় মগরা নিয়ে যায়। সাথে সাথে মায়ানমারের সামরিক বাহিনী রোহিঙ্গাদের উঠার এমন অমানুষিক নির্যাতন চালায় যা পরবর্তীতে তাদেরকে অন্য একটি দেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য করে। আর বাংলাদেশের মত এমনিতে জনবহুল ও ক্ষুদ্র রাষ্ট্রের জন্য যা আসলেই সংকট তৈরি করে।

রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে ব্যাপক কূটনৈতিক তৎপরতার পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৭৮ সালে জুলাই মাসে মায়ানমারের একটি প্রতিনিধি দল ঢাকায় আসে। এ সময় ৩টি ক্যাটাগরিতে ভাগ করে সকল রোহিঙ্গা শরণার্থীকে ফেরত নেয়ার বিষয়ে দু’দেশের মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এ চুক্তির ফলে ১৯৭৮ সালের ৩১শে আগস্ট থেকে ১৯৭৯ সালের ২৯ ডিসেম্বরের মধ্যে বাংলাদেশের আগত ১ লাখ ৮৭ হাজার ২৫০ রোহিঙ্গার প্রত্যবসান সম্ভব হয়। রোহিঙ্গা সমস্যা নতুন রূপ লাভ করে যখন আবার ১৯৯১ সালের মাঝামাঝি মায়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে “অপারেশন পিয়েথারা” নামে দমন পীড়ন অভিযান পরিচালনা করে। আরাকান প্রদেশের দুটি প্রধান শহর মংডু ও যথইং থেকে রোহিঙ্গা মুসলমানদের বিতাড়িত করে সেখানে বৌদ্ধ রাখাইনদের পুনর্বাসিত করা হয়। যার ফলে প্রায় আড়াই লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। এ সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশের বন্ধুপ্রতিম চীন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং জাতিসংঘের মাধ্যমে মায়ানমারের উপর কূটনৈতিক চাপ প্রদান করে। একই সাথে সার্ক ও আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোকে এ ব্যাপারে বাংলাদেশকে সহায়তা করতে অনুরোধ জানায়। পরিশেষে ১৯৯২ সালের ২৮ এপ্রিল মায়ানমারের সামরিক সরকার শরণার্থী প্রত্যাহারের ব্যাপারে পুনরায় বাংলাদেশের সাথে একটি সমঝোতা চুক্তিতে সম্মত হয়। ওই চুক্তি অনুযায়ী প্রায় ২ লাখ ৩০ হাজার রোহিঙ্গার প্রত্যবসান সম্ভব হয়।

তবে এখনও প্রায় ২৭ হাজার রোহিঙ্গা কক্সবাজারের নয়াপাড়া ও কুতুব খালির শরণার্থী শিবিরে অবস্থান করছে। তৃতীয় আরেকটি ক্যাম্প ‘লেদা ক্যাম্পে’ও শরণার্থী পুনর্বাসন শুরু হয়েছে। ক্যাম্পে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাই কমিশনের পাশাপাশি বিভিন্ন এন.জি.ও কাজ করছে। যেমন ‘এমএসএফ’ (হল্যান্ড) স্বাস্থ্য সেবা দিয়ে থাকে, ‘পাল্স’ শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষা বিতরণে কাজ করছে। ক্যাম্পে প্রত্যেক পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ রেশন দেওয়া হয়। এমনকি একদিন বয়সী বাচ্চার জন্যও পূর্ণবয়স্কের সমপরিমাণ রেশন সুবিধা রয়েছে। ফলে রেশন পাওয়ার আশায় ক্যাম্পের শরণার্থীরা বেশি বেশি সন্তান জন্ম দিয়ে থাকে। ক্যাম্পে প্রতি পরিবারে গড়ে ৭.২ জন সন্তান রয়েছে। যা বাংলাদেশের সার্বিক জনসংখ্যা পরিস্থিতিতে বিরূপ প্রভাব ফেলবে। ক্যাম্পে বসবাসকারী অনেক শরণার্থী অস্ত্র, মাদক, নারী ও শিশু পাচারের মত কাজগুলোর সাথেও জড়িত। যার ফলে তারা সেখানে প্রতিনিয়ত নানা সমস্যা সৃষ্টি করছে। এ অবস্থা যদি অব্যাহত থাকে তাহলে ভবিষ্যতে এদের পরিমাণ লাখ ছাড়িয়ে যাবে। যা বাংলাদেশের জন্য নিঃসন্দেহে বড় বিপদ ডেকে আনবে। রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশের সুশীল সমাজ প্রতিনিয়ত পলিসি সুপারিশ করছে। পত্র-পত্রিকায়ও লেখালেখি হচ্ছে। এ সমস্যা সমাধানের জন্য মায়ানমার ও বাংলাদেশ সরকার পর্যায়ের উদ্যোগই সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। তাছাড়া চীনের ইউনান প্রদেশ, বাংলাদেশ, মায়ানমার, লাওস, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড ও ভারতের পূর্বাঞ্চলের মধ্যে উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতার যে প্রস্তাব চীন দিয়েছে তার সফল বাস্তবায়নে মায়ানমার বাংলাদেশ সমঝোতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা চাই না শরণার্থী রোহিঙ্গা সমস্যা এক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়াক।

 

মোহাম্মদ তরিক উল্লাহ