চীন-ভারতের প্রভাব বিস্তারের লড়াই এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ

ভারতের ন্যায় চীনের সাথে তার প্রতিবেশীদের বৈরিতা নেই, বরং দেশটি ভারতের নিকটবর্তী প্রতিবেশীদের মধ্যেও অবস্থান করে নিতে সক্ষম হয়েছে। চীনের নমনীয় নীতির কারণেই দেশটি কাশ্মীর ইস্যতে সুবিধাজনক অবস্থানে আছে। পাকিস্থান অধিকৃত কাশ্মীরে চীনের উন্নয়ন কার্যক্রম ভারতের জন্য প্রতিকূল। আর বড় বিষয় হল চীন কখনোই কাশ্মীরকে ভারতের অংশ বলে মেনে নেয়নি। তাই চীনের ক্রমবর্ধমান শক্তির প্রেক্ষাপটে এশিয়ার আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরেই চীন সবচেয়ে প্রভাবশালী অবস্থান বজায় রেখেছে।এর বড় কারণ পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহৎ অর্থনৈতিক শক্তি প্রয়োজনে কাশ্মীরকে পৃথক সত্তা রূপে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইতেও পারে। কিছুদিন হলো বেইজিং কাশ্মীরকে আলাদা রাষ্ট্র হিসেবে চিহ্নিত করার প্রয়াস পাচ্ছে বলে ভারতের কাছ থেকে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। এর প্রমাণ হিসেবে তারা বলছে,চীনা দূতাবাস কাশ্মীরিদের জন্য ভিসা ভারতীয় পাসপোর্টে না দিয়ে আলাদা কাগজে দিচ্ছে।
তিব্বতসহ আশপাশের এলাকা সফরকারী পর্যটকরা জানিয়েছেন, এসব এলাকায় এমন অনেক চীনা মানচিত্র পাওয়া যায় যাতে কাশ্মীরকে আলাদা দেশ হিসেবে দেখানো হয়েছে। এ ব্যাপারে প্রচার পত্রও নাকি দেখেছেন তারা। তিব্বতকে চীনের অংশ হিসেবে মেনে নিলেও ভারতের অরুণাচলকে চীন দক্ষিণ তিব্বত হিসেবে মেনে নেয়নি। তবে এক্ষেত্রে ভারতের জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা বেশি ম্যাকমোহন লাইনের সীমারেখার কারণে। ভারতের চিন্তার বিষয় হলো সেভেন সিস্টারসের অন্যান্য প্রদেশগুলোর বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন নিয়ে। এছাড়া চীনের সাথে ভারতের যদি কোন ছোট খাট ও স্বল্পস্থায়ী যুদ্ধও হয় ,তবুও এ কৌশলগত ভূখণ্ডে চীন হস্তক্ষেপ করে স্বাধীন অঞ্চলে রূপ দিতে পারে। চীন ইতোমধ্যেই মিয়ানমার, শ্রীলংকা ও পাকিস্থানে সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করে দিয়েছে। বঙ্গোপসাগরে ভারতের নিয়ন্ত্রণের উপর এটি স্পষ্টতই চীনের জয়। হংকং থেকে সুদান পর্যন্ত আরও কয়েকটি বন্দর নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে চীনের। তবে এসব বন্দরের মাধ্যমে চীন ভারতের উপর কতটুকু খবরদারি করতে সক্ষম হবে এ ব্যাপারে যথেষ্ট সন্দেহ আছে।
ভারত চীনকে ঘিরে ক্রমেই একটি সামরিক বলয় গড়ে তুলছে। এ বলয়ে বড় শক্তিগুলোর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র,জাপান ও অষ্ট্রেলিয়া। চীনের সাথে কখনও যুদ্ধ বাধলে দেশটির বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ সৃষ্টিও এর লক্ষ্য। অবরোধের ফলে মিলিটারি হার্ডওয়্যারের জন্য জরুরি জ্বালানি প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হবে চীন। এতে বিপুল সমরশক্তি ও জনবল থাকার পরও দেশটিকে সহজেই হারিয়ে দেয়া সম্ভব হবে। নৌ শক্তি বৃদ্ধি এবং ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরে যুক্তরাষ্ট্র, ইইউ, জাপান, অষ্ট্রেলিয়া, কানাডা, দক্ষিণ কোরিয়া ও ইসরাইলের সাথে সম্পর্ক জোরদারের ক্ষেত্রেও ভারতের লক্ষ্য একটিই। এ লক্ষ্যে দেশটি মিয়ানমার, আফগানিস্থান, ইরান এমনকি মধ্য এশিয়া পর্যন্ত নিজের উপস্থিতি জোরদার করে চলেছে। বিদেশের মাটিতে প্রথমবারের মতো তাজিকিস্থানে সেনা ঘাটি স্থাপন করেছে ভারত। আফগানিস্থানে স্পষ্টতই ভারতের প্রভাব বাড়ছে। পাকিস্থান ভাঙনের হুমকির মুখে রয়েছে। পাকিস্থান থেকে বেলুচিস্তান প্রদেশ বিভক্ত হলে ভারতের জন্য বড় ধরনের সুবিধা তৈরি হবে। আর বেলুচিস্তানের অন্তর্গত গোয়াদর বন্দরও বলয়ের বাইরে যেতে পারে। বেলুচিস্তানের ধর্মনিরপেক্ষ নেতৃবৃন্দের সাথে দিল্লির ঐতিহাসিক সম্পর্কই এর কারণ।
তবে এক্ষেত্রে একমাত্র বাধা হতে পারে ইরান। কারণ ইরানেও বালুচ গোষ্ঠী আছে এবং এতে ইরানের স্বার্থ ক্ষুণœ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তবে পাকিস্থানের বিরুদ্ধে একটি বড় পরিকল্পনা হিসেবে এটি এখন আর গোপন নেই। এক্ষেত্রে পাকিস্থানের পক্ষে খুব বেশি কিছু করা সম্ভব বলে মনে হয় না। চীনের পক্ষে ভবিষ্যতে পাকিস্থানের খুব বেশি ভূমিকা রাখাও সম্ভব হবে না, যদি তারা যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমাদের সাথে সম্পর্ক চায়। নেপালে চীনের চেয়ে ভারতের ভূমিকা অধিক দেখা যাচ্ছে। তবে এ দুই জায়ান্টের লড়াইয়ে নেপালের বড় ভূমিকা না থাকার সম্ভাবনাই বেশি। বাংলাদেশকে ভারত তিনদিক দিয়ে ঘিরে রয়েছে এবং চীনের অনুকূলে বড় ধরনের ভূমিকা রাখা তার পক্ষে সম্ভবও নয়। মিয়ানমারের চীনের পক্ষে ভূমিকা রাখার ব্যাপারে সম্ভাবনা বেশি, তাদের জাতীয় স্বার্থের সঙ্গেই এই বিশ্লেষণ চলে আসে। মূল বিষয় হচ্ছে এ অঞ্চলের ছোট দেশগুলো পরাশক্তিগুলোর স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করে চলবে বলে ধারণা করছেন বিশ্লেষকরা। তবে এ অঞ্চলে বড় ভূমিকা পালন করবে যুক্তরাষ্ট্র। সাথে থাকবে ইসরাইল, অষ্ট্রেলিয়া, জাপান প্রভৃতি মার্কিন সমর্থক দেশ। এদের যৌথ ভূমিকা বজায় থাকলে ভারতের জয়ী হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। এতে চীনের পরিবর্তে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব সমগ্র এশিয়া জুড়ে প্রতিস্থাপিত হতে পারে। বিশ্বের এরূপ সম্ভাব্য সংঘাতের অবস্থা হান্টিংটনের ক্ল্যাশ অব সিভিলাইজেশনের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। এ পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে চীনের সমর্থক হবে নিশ্চিত রূপে মুসলিম দুনিয়ার ভবিষ্যৎ শক্তিশালী দেশসমূহ, যেমন-ইরান, মিশর, তুরস্ক, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া। ফলে বাংলাদেশ কোন পক্ষে থাকবে সেটা নিয়ে ভাবতে হবে।
চীন-ভারতের লড়াইয়ে যুক্তরাষ্ট্র-ভারত-ইসরাইলের পক্ষে থাকলে তাদের সেবা দাস হয়ে থাকতে হবে। মুসলিম দেশগুলোর সাথে বিরোধ সৃষ্টি হবে আর আমাদের জাতীয় পরিচিতি নিঃশেষ হতে থাকবে, পরীক্ষিত বন্ধুদের হারাবে বাংলাদেশ। যদি নিরপেক্ষ অবস্থানে থাকতে চায় বাংলাদেশ, তবুও বাংলাদেশকে শত বিরূপ পরিস্থিতির শিকার হতে হবে। যেমন-বাংলাদেশের চট্টগ্রাম নিয়ে পশ্চিমা ষড়যন্ত্র হওয়া, নতুন কোন বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের মুখোমুখি হওয়া এবং ভারতের সাথে জড়িত ইস্যুর গুরুতর প্রতিকূলে যাওয়া, যা বাংলাদেশকে একটি কার্যকর ও স্বাধীন রাষ্ট্র রূপে টিকে থাকতে বাধা দেবে। বিশ্ব রাজনীতিতে আমাদের জাতীয় স্বার্থের পক্ষে থাকাটাই হবে যৌক্তিক। আমরা আমাদের স্বতন্ত্র জাতিসত্তা আঁকড়ে ধরে রাখতে সক্ষম হব কিনা সেটা নির্ভর করছে আমাদের জাতিসত্তার বিকাশের উপর। তাই বিষয়টি সময় থাকতেই ভাবতে হবে, সতর্ক হতে হবে এবং সে অনুযায়ী নীতি প্রণয়ন করতে হবে। এতেই বোধহয় দেশের উপকার হবে।