Bangla Newspapers
English Newspaper

Logo of AL
বর্তমান ক্ষমতাসীন মহা জোট সরকার নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ২০০৮ সালের ১২ ডিসেম্বর “দিন বদলের সনদ” নামে একটি নির্বাচনি ইশতিহার ঘোষণা করেছিল। এ ইশতিহার সাধারণ বিবেচনায় ইতিবাচক। ইশতিহারে যে বিষয়গুলোর প্রতি বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছিল; তার সঙ্গে জনগণের আশা আকাক্সক্ষার মিল ছিল। অবশ্য নির্বাচনি ইশতিহারে ভাল ভাল প্রতিশ্র“তি থাকার বিষয়টি নতুন কিছু নয়। কিন্তু বাস্তবায়ন দিকটি খুবই দুর্বল।
এ ইশতিহারে ৫টি অগ্রাধিকারের বিষয় ঠিক করা হয়েছিল। এছাড়া ১৮টি বিভিন্ন ক্ষেত্রকে অন্যান্য কর্মসূচীর আওতায় আনা হয়। আমরা এ আলোচনায় সরকারের অগ্রাধিকারের ৫টি দিক দেখার চেষ্টা করব।
দ্রব্যমূল্য সহনীয় পর্যায়ে রাখা: দ্রব্যমূল্যের দুঃসহ চাপ প্রশমনের লক্ষ্যে চাল, ডাল, তেলসহ নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম কমিয়ে জনগণের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে স্থিতিশীল রাখার ব্যবস্থা করা হবে। মজুদদারি, মুনাফাখোর সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়া এবং চাঁদাবাজি বন্ধ করা হবে। এরকম প্রতিশ্র“তি থাকলেও বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। সবকিছুর দাম বেড়েই চলেছে। মাসের ব্যবধানে চালের দাম বেড়েছে চার পাঁচ টাকা করে। বোতলজাত তেলের দাম ১২০-১২৫ টাকা। চিনি ৭৫ টাকা, আটা প্রতি কেজি ২৫-৩০ টাকা, রশুন ১৬০-১৭০ টাকা। ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) প্রকাশিত এক তথ্য মতে, জোট সরকারের মেয়াদ শেষে দ্রব্য মূল্য ছিল- মোটা চাল ১৮ টাকা, সয়াবিন তেল ৫৪ টাকা, আটা ১৮ টাকা, মশুর ডাল ৫২ টাকা, চিনি ৩৬ টাকা এবং ডিজেল প্রতি লিটার ৩৩ টাকা। আর দু’বছর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমল শেষে বর্তমান সরকার ক্ষমতা নেওয়ার সময় মোটা চাল ছিল প্রতি কেজি ২৪-২৫ টাকা, চিকন চাল ৩২-৩৮ টাকা, প্রতি কেজি আটা ছিল ২২-২৪ টাকা, প্রতি লিটার সয়াবিন তেল ছিল ৮২-৮৬ টাকা। পিয়াজ ছিল ৩২-৩৬ টাকা, রশুন ছিল ২৪-৩২ টাকা এবং চিনি ছিল ৩০-৩২ টাকা। মহা জোট সরকারের আড়াই বছরের মধ্যে দ্রব্যমূল্য ২-৩ গুন বৃদ্ধি পেয়েছে যা একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য আশার দিক নয়। আর এ লাগামহীন দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির ফলে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মধ্যবিত্ত ও নিুবিত্ত শ্রেণি। কারণ যে হারে দ্রব্যের দাম বাড়ছে সে হারে মানুষের আয় বাড়ছে না।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা: দুর্নীতি দমন কমিশনের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, রাষ্ট্র ও সমাজের সকল স্তরের ঘুস, দুর্নীতি উচ্ছেদ, চাঁদাবাজি, টেন্ডার বাজি, কালো টাকা, পেশি শক্তির ব্যবহার রোধ ও নির্মূলের কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের কথা থাকলেও কার্যত এর চিত্র ভিন্ন। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল এর বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান আরো একধাপ নীচে নেমেছে, অর্থাৎ দুর্নীতি তুলনামূলক বেড়েছে। টিআইবি’র জাতীয় খানা জরিপ ২০১০ এর জরিপ মতে, সেবা খাতের মধ্যে দেশের বিচার বিভাগ সবচেয়ে দুর্নীতি গ্রস্ত। ৮৮ শতাংশ খানা এ খাতের দুর্নীতির শিকার। কিন্তু ২০০৭ সালে বিচার বিভাগের দুর্নীতি ও হয়রানির শিকার ছিল ৪৭.৭% খানা। এ হিসেবে এ খাতে দুর্নীতির হার বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। এরপরই রয়েছে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী ও ভূমি প্রশাসন। দুদককে কার্যকর করার কথা থাকলেও ঘটেছে তার বিপরীত। সংসদের মাধ্যমে আইন করে দুদক’কে নখহীন বিড়ালে পরিণত করা হয়েছে। কেড়ে নেয়া হয়েছে এর স্বাধীনতা। কোনো সরকারী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা করতে হলে সরকারের অনুমতি নেয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। স্বজনপ্রীতি, দলীয়করণের অভিযোগ উত্থিত হচ্ছে অহরহ।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি : ২০১১ সালের মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন ৫ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত করার কথা থাকলেও নতুন বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়া হচ্ছে না। নেই নতুন ভাবে গ্যাস সংযোগের ব্যবস্থাও। বিদ্যুৎ ও গ্যাস সমস্যা সমাধানে সরকার স্বল্প মেয়াদে বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে। এ ধরনের বিদ্যুৎ কেন্দ্র তৈরির জন্য কার্যাদেশ দেয়া হয় ৩-৬ মাসের মধ্যে বিদ্যুৎ পাওয়ার জন্য। কিন্তু সরকারের মেয়াদের মধ্য পর্যায়ে আসার পরও সব ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র উৎপাদনে আসেনি। কয়েকটি কেন্দ্র একাধিকবার সময় বাড়ানোর পরও উৎপাদনে আসতে পারেনি। কয়েকটি কোম্পানি প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়ে হাল ছেড়ে দিয়েছে। নতুন সংযোগের অভাবে হাউজিং সেক্টর ও নির্মাণ শিল্পে সৃষ্টি হয়েছে অচলাবস্থার। গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধির পর তা দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাধ্যমে নতুন সংযোগ দেওয়ার কথা থাকলেও গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধির কার্যকর কোন উদ্যোগ নেই। বাপেক্সের মাধ্যমে গ্যাস অনুসন্ধানের কার্যক্রম অনেকটাই স্থবির। নতুন করে স্থলভাগের সম্ভাবনাময়ী ব্লক বিদেশি কোম্পানিকে লিজ দেওয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। মার্কিন কোম্পানি কনোকো ফিলিপসের সাথে সরকার দেশের স্বার্থ বিরোধী চুক্তি করেছে। তত্ত্বাবধায়ক আমলে যেখানে ৪ হাজার ১০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়েছে সেখানে বর্তমানে গড়ে উৎপাদিত হচ্ছে ৩৮০০ থেকে ৩৯০০ মেগাওয়াট। কিন্তু আওয়ামী লীগের নির্বাচনি ওয়াদা ছিল বিদ্যুৎ উৎপাদন ৫০০০ মেগাওয়াট এ উন্নীত করবে।
দারিদ্র্য ঘুচাও বৈষম্য রুখো: ইশতিহারে লেখা ছিল দারিদ্র্য বিমোচনের প্রধান কৌশল হবে কৃষি ও পল্লী জীবনে গতিশীলতা আনয়ন। ২০১৩ সালের মধ্যে দারিদ্র্য সীমা ও চরম দারিদ্র্যের হার যথাক্রমে ২৫ ও ১৫ শতাংশে নামিয়ে আনা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে দারিদ্র্যের সাথে বৈষম্যের মাত্রা পূর্বের চেয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে সম্পদ ও সুযোগের বৈষম্য। দেশের ৫ শতাংশ সর্বাধিক ধনী পরিবারের জাতীয় আয়ের শেয়ার ৩০ শতাংশ একই দিকে দেশের ৫ শতাংশ সর্বাধিক দারিদ্র্য পরিবারের শেয়ার ০.৬০ শতাংশ। অর্থাৎ ধনী-দারিদ্র্যের বৈষম্যের হার প্রায় ২৮-৩০ গুন। বর্তমান সরকারের ক্ষমতা গ্রহণের ২ বছর ৫ মাস শেষ হলেও দারিদ্র্য সীমা ও চরম দারিদ্র্য সীমার হার তেমন পরিবর্তন হয়নি।
সুশাসন প্রতিষ্ঠা: বিচার বিভাগের প্রকৃত স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা, বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধ করা, জাতীয় সংসদকে কার্যকর ও সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সহিষ্ণুতা গড়ে তোলা, দলীয় প্রভাবমুক্ত অরাজনৈতিক গণমুখী প্রশাসন প্রতিষ্ঠা সহ যোগ্যতা, জেষ্ঠতা ও মেধার ভিত্তিতে সব নিয়োগ ও পদোন্নতি নিশ্চিত করার কথা ইশতিহারে থাকলেও তা বাস্তবে নেই। বর্তমান সংসদের প্রধান বিরোধী দল বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে সংসদের বাইরে অবস্থান করছে। তাছাড়া সংসদে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ কোন বিষয় নিয়ে এখন কথা হয় না বললেই চলে। সরকার ক্রসফায়ার বন্ধ করার কথা বললেও তা বন্ধ না হয়ে বরং পূর্বের চেয়ে বেড়েছে। মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের প্রতিবেদন অনুযায়ী গত দু’বছরে ক্রসফায়ার সহ বিনা বিচারে হত্যার শিকার হয়েছে ২৮১ জন। বিচার বিভাগ মারাত্মক ভাবে সমালোচিত হয়েছে দলীয় আনুগত্য ও দল প্রীতির অভিযোগে। রাজনৈতিক সহিষ্ণুতার বাস্তবতা হচ্ছে বিরোধী দলগুলোর নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের ক্ষেত্রেও প্রবল বাধার সম্মুখীন হওয়া। তাছাড়া মিথ্যা মামলা, হামলা, হুমকি নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনা। প্রশাসন স্থবির হয়ে পড়েছে চরম দলীয় করণে। দলীয় বিবেচনায় ও এসডি, বদলি, পদোন্নতির ঘটনা প্রতিনিয়ত পত্রিকায় প্রকাশিত হচ্ছে।
ইশতিহারের আলোকে যে সকল কাজ বাস্তবায়িত হয়েছে: গুরুত্বপূর্ণ বা অগ্রাধিকারের বিষয়গুলোতে সরকারের অর্জন হতাশাব্যাঞ্জক হলেও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যার বিচারের রায় কার্যকর করা, রংপুরকে নতুন বিভাগ হিসেবে ঘোষণা করা, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের উদ্যোগ গ্রহণ, পদ্মা সেতু নির্মাণের কাজ শুরু করা, ঘরে ঘরে চাকুরির অংশ হিসেবে কিছু লোকের চাকুরির ব্যবস্থা করার মাধ্যমে সরকার কিছুটা অর্জন করেছে।
সুতরাং এ সরকারের আমলে যে কাজগুলো করা সম্ভব হয়েছে তার ধারাবাহিকতায় উল্লেখিত ৫টি অগ্রাধিকারের বিষয়, যা জনগণের মৌলিক ও গুরুত্বপূর্ণ চাহিদার অংশ তা বাস্তবে রূপ দেয়ার ব্যাপারে সরকারের এখনই পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। তা না হলে ‘দিন বদলের সনদ’ জনগণের দুর্দিন বয়ে আনতে পারে। জনগণ সরকারের কাছে জন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে সফলতা কামনা করে।
শিহাবউদ্দীন (ইনান)