Bangla Newspapers
English Newspaper
মধ্যপ্রাচ্য সংকট সেই ১৯৪৮ সাল থেকে, যখন সমগ্র আরব বিশ্বকে স্তম্ভিত করে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা হয়। প্রথম দিকে আরব বিশ্ব একত্রিত হয়ে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা এবং মধ্যপ্রাচ্য ও আরব বিশ্বের তেল সম্পদের ওপর পশ্চিমাদের লোলুপ দৃষ্টিকে প্রতিহত করার চেষ্টা করলেও পরে তা আর সম্ভবপর হয়ে ওঠেনি। গত শতকের ষাটের দশকের শেষের দিক ও ৭০’ দশকের প্রথম দিক থেকে সমগ্র আরব বিশ্ব স্বৈরাচারী শাসন ও একনায়ক কেন্দ্রিক শাসনে ছেয়ে যায়। বলা বাহুল্য সমগ্র আরব বিশ্বের বর্তমান পরিস্থিতির জন্য স্বৈরশাসনও অনেক খানি দায়ী। আবার ২০০৩ থেকে ২০১০ পর্যন্ত ইরাক যুদ্ধ। অবশেষে ২০১১ সালে মধ্যপ্রাচ্যসহ আরব বিশ্ব ও আফ্রিকার কয়েকটি দেশ গণবিক্ষোভে ফেটে পড়ে। লিবিয়া, মিশর, সিরিয়া, ইয়েমেন, তিউনিশিয়া সহ সকল দেশের এই গণবিক্ষোভের পেছনে রয়েছে ওবামা ও মার্কিন প্রশাসনের জোর সমর্থন। ২০০৯ সালে বারাক ওবামার মিশর সফর ও আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে সেই ঐতিহাসিক ৪৭ মিনিটের ভাষণ মূলত বর্তমান আরব পরিস্থিতির কিছুটা প্রতিচ্ছবি। ঐ সময় তিনি ইঙ্গিতে সমগ্র আরব জনগণকে উসকে দেন। মধ্যপ্রাচ্য ও আবর বিশ্বের এ সংকটের পেছনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও শক্তিধর অন্যান্য দেশগুলোর বড় ধরনের স্বার্থ কাজ করছে।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় মার্কিনিরা কখনও নিজ স্বার্থ ছাড়া কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করে না। লিবিয়ার প্রেসিডেন্ট মুয়াম্মার গাদ্দাফি দীর্ঘ ৪২ বছর ক্ষমতায় আছেন। তার কর্মকাণ্ড নিয়ে অনেক সমালোচনা থাকলেও তিনিই লিবিয়াকে অর্থনৈতিক দিক থেকে অনেক অগ্রসর মান করতে পেরেছিলেন। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা হল ৭০’ দশকে যখন লিবিয়া সহ কয়েকটি তেল সমৃদ্ধ দেশ আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের উপযুক্ত মূল্য থেকে বঞ্চিত হত, পশ্চিমা দেশগুলো তেলের বাজারমূল্য নিয়ন্ত্রণ করে সমগ্র তেলের বাজার থেকে তেল সংগ্রহ করত ও চড়া দামে তা অন্যান্য দেশে বিক্রি করত, ঠিক তখন গাদ্দাফি নিজ দেশের কল্যাণ সাধনে এই তেলের দাম অস্বীকার করেন। তিনি উপযুক্ত দাম ব্যতীত তার দেশ থেকে তেল বিক্রি বন্ধ করেন। ফলে লিবিয়া অন্যতম প্রধান তেল সমৃদ্ধ দেশ হওয়ায় পশ্চিমা দেশগুলো আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি করতে ও তেলের ওপর তাদের এই ভয়াবহ আগ্রাসন নীতি কিছুটা বন্ধ করতে বাধ্য হয়। গাদ্দাফির এইসব কর্মকাণ্ডের কারণে বর্তমান পরিস্থিতেও অধিকাংশ জনগণ তাকে সমর্থন করে যাচ্ছে। কিন্তু মার্কিনিরা বিদ্রোহীদের ঘাড়ে বন্দুক রেখে লিবিয়ার তেল দখলে প্রায় সফলতার দ্বারপ্রান্তে। তাছাড়া লিবিয়ায় বিদ্রোহীদেরকে যুদ্ধে টিকিয়ে রাখতে পারলে মার্কিনিদের অস্ত্র ব্যবসাও জমজমাট থাকবে।
এবার আসা যাক অন্যান্য শক্তিধর দেশগুলো সম্পর্কে। লিবিয়া থেকে তেল আমদানিতে সবচেয়ে বেশি এগিয়ে ইতালি। লিবিয়া থেকে তার আমদানির পরিমাণ ৩৮.৫ ভাগ। এরপরই জার্মানি সহ ইউরোপীয় ইউনিয়ন ভুক্ত অন্যান্য দেশগুলোর স্বার্থই বেশি। যার প্রমাণ মেলে ইতালির ক্ষেত্রে। তারা ন্যাটোকে সহযোগিতা করার লক্ষ্যে সর্বাধিক সংখ্যক সেনা সদস্য প্রেরণ করেছে। সামরিক সহায়তায় তাদের বিমান ঘাঁটিগুলো ব্যবহার করতে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রও তাদের আগ্রাসন নীতিতে অনেকটা পরিবর্তন এনেছে। ইরাক আফগানিস্তানের মত তারা সরাসরি হস্তক্ষেপ করছে না। এমনকি তাদের পুরোনো বন্ধু ইসরাইলও নিশ্চুপ। তারা এখন ন্যাটো, জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও জনগণকে পুঁজি করে মধ্যপ্রাচ্যসহ আফ্রিকায় তাদের প্রভাব টিকিয়ে রাখছে। এর কারণ হচ্ছে ইরাক ও আফগানিস্তানে যুদ্ধের ফলে তাদের ব্যাপক অর্থনৈতিক ক্ষতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি বিশ্ববাসীর অসমর্থন।
লিবিয়ার অস্ত্র সংগ্রহের প্রধান উৎস রাশিয়া। তাছাড়া তেল উত্তোলনে রাশিয়ার অনেক তেল কোম্পানি যুক্ত। কিন্তু হতাশার কথা হলো রুশ সরকার এই আগ্রাসনকে সমর্থন জানিয়েছে। আবার নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করার লক্ষ্যে জাতিসংঘ আরোপিত নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা করছে। অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ক্ষেত্রেও রাশিয়া আজ প্রশ্নের সম্মুখীন। দিমিত্রি মেদভেদেভ এই আগ্রাসনের সমর্থন জানালেও রাশিয়ার প্রধানমন্ত্রী ভাদিমির পুতিন এর বিরোধিতা করেছেন। আবার বর্তমানে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে রাশিয়ার পদচারণাও অত্যন্ত নাজুক। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ জানালেও বিশ্ব রাজনীতি অনেকটাই তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। আরেকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হল লিবিয়ার অন্যতম তেল সমৃদ্ধ নগরী বেনগাজী বিদ্রোহীদের দখলে আসার পর সেখানের তেল খনিতে তেল উত্তোলনের দায়িত্ব পেয়েছে চীনের একটি কোম্পানি।
সব মিলিয়ে এটাই পরিলক্ষিত হচ্ছে যে নিজ স্বার্থের কারণে বিশ্বের শক্তিধর দেশগুলো একত্রিত হচ্ছে। আগামী বিশ্বের নিয়ন্ত্রণকারী শক্তিগুলোর মধ্যে সবাই চীনকে এগিয়ে রাখলেও এখন পর্যন্ত তার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। কারণ বর্তমান বিশ্ব রাজনীতি এখনও যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে। তাছাড়া শক্তিমত্তার দিক থেকেও চীন যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে অনেক পেছনে অবস্থান করছে। তাছাড়া মার্কিন নীতিও সঠিক রয়েছে বলে মনে হচ্ছে।
মেহদাদ কবির উৎসব