মিরসরাই : মর্মান্তিক ট্রাজেডি, যা কখনো ভুলবার নয়

মিরসরাই : মর্মান্তিক ট্রাজেডি, যা কখনো ভুলবার নয়

Hearts are Crying for Hearts

আমি তখন ক্লাস থ্রিতে পড়ি। বাংলা পাঠ্য বইয়ের ‘আদর্শ ছেলে’ নামে একটি কবিতা পড়ার সুযোগ পাই। কবিতাটি পড়ে হৃদয়ের ভিতর সেদিন যে অনুভূতি জন্মেছিল তা আজও আমাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। কবি কুসুম কুমারী দাস তার কবিতায় বলেছেন -
“আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে
কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে”
কবি এখানে হীনমন্যতা সংকীর্ণতা ও কথার ডিগবাজি থেকে দুরে থেকে বাস্তব বিশ্বাসী একজন মানুষ হবার নোটিশ জারি করেছেন। কিন্তু কবির কবিতাটির যথার্থ মূল্যায়ন সমাজের বুকে আজও প্রতিষ্ঠিত হয়নি। আর দেশের জন্য আমরা যত না বেশি কিছু করি তার চেয়ে নিজেকে প্রকাশিত করা মানসে বেশি মেতে উঠি। এটা কি একজন খাটি দেশ প্রেমিকের পরিচয়? আর যারা দেশ পরিচালনার কাজে নিয়োজিত তাদের কি উচিত নয়; জনগণের কল্যাণে জীবনটাকে উৎসর্গ করার মধ্যে সার্থকতা খুঁজে বেড়ানো। কিন্তু এ প্রত্যাশার বাস্তব প্রতিফলন আমরা কি দেখতে পাই? কোন সমস্যায় যখন আমাদের জীবন অতিক্রম হতে থাকে!

যখন নানা উৎকণ্ঠতার মধ্যে জনজীবন বিধ্বস্ত হতে চলে; ঠিক তখনই আমাদের প্রতিনিধিদের ঘুম ভাঙে, টনক নড়ে। তেমনটিই দেখলাম মিরসরাইয়ের তরতাজা সম্ভাবনাময় অর্ধ শত শিশুরা যখন ওপারের ভুবনে চলে গেল। আমাদের প্রধান মন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা, বিরোধী দলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া, বর্তমান মন্ত্রীসভার অনেক সদস্য ও অন্যান্য দায়িত্বশীল ব্যক্তি সহ কেঁদেছেন এদেশের আপামর জনতা। ব্যাপক সমবেদনা! ব্যাপক আহাজারি! কিন্তু একটি ঘটনা অতীত হলে আমাদের অনুভূতি শক্তি ভোঁতা হয়ে যায়।

ঘাতক ট্রাক

গত ১১ জুলাই মিরসরাই অর্ধ শত ফুটফুটে নিষ্পাপ শিশুদের এই অকাল মৃত্যু সত্যই বড় বেদনার! বড় কষ্টের! কিন্তু তাদের এই হারিয়ে যাওয়ার পেছনে আমাদের ব্যর্থতার পরিসংখ্যান কি হিসাব নিকাশ করেছি? মিরসরাইর শহীদ হওয়া শিশুরা আমাদের প্রতি যে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে গেল আমরা কি তার উত্তর দিতে প্রস্তুত? আমি মনে করি নিঃসন্দেহে আমরা অকৃতকার্য হব। অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটার পর মিডিয়ার মুখোমুখি হন আমাদের দেশ পরিচালনা পর্ষদ। তারা তাদের দায় সারা বক্তব্য পেশ করেই ক্ষান্ত কিন্তু বাস্তব পদক্ষেপ না থাকায় পরবর্তীতে আবারও জবুথবু অবস্থার সম্মুখীন হতে হয়। আমরা কি মিরসরাইয়ের অর্ধ শত শিশুর এই অনাকাক্সিক্ষত মৃত্যুর ব্যাপারে গভীর ভাবে চিন্তা করেছি? আমরা কি এই হত্যা কাণ্ডের নিগূঢ় রহস্যের জাল উদ্ঘাটন করতে পেরেছি? আমি মনে করি অদক্ষ লাইসেন্স বিহীন ড্রাইভার, ড্রাইভারের স্বেচ্ছাচারিতা, যাতায়াত ব্যবস্থার অনুন্নত অবস্থা সহ নানা সমস্যার কবলে অকালে প্রাণ দিতে হল সম্ভাবনাময় এ সূর্যগুলোকে। যারা আগামী দিনে এদেশের একজন রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, সেরা বিজ্ঞানী, সেরা চিকিৎসক, জ্ঞান তাপস, গুণী শিল্পী অথবা মহাশূন্য বিজয়ী বাঙালী হতে পারতো। কিন্তু তাদের স্বপ্নগুলোকে গলা টিপে হত্যা করল এক ঘাতক ট্রাক। হয়তো সন্তান হারা পিতা-মাতাকে আমরা একটা মুখস্থ সান্ত্বনা দিয়ে আমাদের দায়িত্ব কর্তব্য শেষ করে ফেলেছি। সান্ত্বনাটি হল ‘আল্লাহর মাল আল্লাহই নিয়ে গেছে’ বা ‘তাদের মৃত্যু এভাবে লেখা ছিল’ অথবা ‘রাখে আল্লাহ মারে কে, মারে আল্লাহ রাখে কে’ এসব নানা হিজিবিজি বক্তব্য। কিন্তু আমাদের এই বক্তব্য কি সন্তান হারা পিতা-মাতার হৃদয়ের শূন্যতার হাহাকার বিন্দুমাত্র মুছে ফেলবে? একটা প্রবাদ আছে ‘যার জালা সেই বোঝে’। ‘যার যায় তার যায়’। এ বিষয়টি কবি কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদার তার ‘সমব্যথী’ কবিতায় আরো স্পষ্ট করেছেন-
চিরসুখী জন ভ্রমে কি কখন
ব্যথিত বেদ বুঝিতে পারে?
কি যাতনা বিষে বুঝিবে সে কিসে?
কভু আশি বিষে দংশেনি যারে।
যার মায়ের কোল চিরদিনের জন্য শূন্য হল সেই বুঝবে সন্তান হারানোর বেদনা। মিরসরাইর মর্মান্তিক, হৃদয় বিদারক ট্রাজেডি থেকে আমরা যদি সচেতন না হই তাহলে সময়ের সামান্য ব্যবধানে সন্তান হারা আরো অনেক মায়ের আহাজারিতে আবারও প্রকম্পিত হয়ে উঠবে আকাশ-বাতাস।

মিরসরাইর ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই গত ২১শে জুলাই দৈনিক জনকন্ঠে একটি ছবি দেখে বড়ই মর্মাহত হলাম। প্রধানমন্ত্রীর ড্রাইভার, তিনি যদি চলন্ত গাড়িতে মোবাইলে কথা বলেন তবে তা অত্যন্ত দু:খ জনক ও লজ্জাকর। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর গাড়ির ড্রাইভার সড়ক নীতিমালা অগ্রাহ্য করলে আইনের তোয়াক্কা করবে কে। উল্লেখ্য ইতিমধ্যে মিরসরাই ট্রাজেডির ঘাতক ট্রাক চালক মফিজকে প্রশাসন গ্রেফতার করেছে এবং তাকে জিজ্ঞাসাবাদ অব্যাহত রেখেছে। আর তাকে উপযুক্ত শাস্তির জন্য জনগণকে প্রশাসন আশ্বস্ত করেছেন। আমার প্রশ্ন- উক্ত চালককে সর্বোচ্চ যাবৎ জীবন কারাদণ্ড বা মৃত্যুদণ্ড দিলেই কি মিরসরাইয়ের মত মর্মান্তিক ট্রাজেডির পরিসমাপ্তি ঘটবে? বরং প্রয়োজনে এ রকম দুর্ঘটনা এড়ানোর জন্য সকলকে নির্দিষ্ট নীতিমালা অনুসরণের ফরমান জারি করা। আর নির্ধারিত নীতি মালা অমান্যকারীকে তাৎক্ষণিক শাস্তির ব্যবস্থা করা। তাহলে হয়তো বা মিরসরাইয়ের মত আর কোন ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে না। প্লিজ লক্ষ্য করুন- মিরসরাই ঘটনা ঘটার পর সংশ্লিষ্ট অনেক ঊর্ধ্বতন ব্যক্তি জনগণকে প্রতিশ্র“তি দিয়েছেন- আগামীতে যাতে মিরসরাইয়ের মত এমন দু:খ জনক ঘটনা আর না ঘটে সেজন্য কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু এ বক্তব্যই কি সড়ক দুর্ঘটনার হাত থেকে রেহাই দেবে? সুতরাং প্রয়োজন সঠিক সিদ্ধান্ত ও তা বাস্তবায়নের অদম্য ইচ্ছা-আগ্রহ। আর লক্ষ পানে পৌঁছাবার প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা চালানো। তাহলে আমরা অবশ্যই অপ্রীতিকর ঘটনার হাত থেকে মুক্ত হতে পারব।
কেন এত দুর্ঘটনা? কেন এত প্রাণহানি? বিষয়টি আরো একটু স্পষ্ট করলেই বুঝা যাবে। বিআরটিএ’র একটি পরিসংখ্যানে দেখা গেছে যে- দেশে রেজিষ্ট্রেশন কৃত যানবাহনের সংখ্যা ১৫ লাখ ৪ হাজার ৮০৯টি। বৈধ লাইসেন্সকারী চালকের সংখ্যা ৯ লাখ ৮২ হাজার ৪৪৭ জন। বিএরটিএ এর সেবা কার্যক্রমের উপর ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ এর জরিপে দেখা যায় শতকরা ৯৭ ভাগ চালকই একজন ঊর্ধ্বতন চালকের সহকারী হিসেবে কাজ করে ড্রাইভিং শিখে। এই চালকদের ১৩ শতাংশ নিরক্ষর, ৪৭ শতাংশ প্রাথমিক, ৩৭ শতাংশ মাধ্যমিক ও ৩ শতাংশ উচ্চ মাধ্যমিক বা তার বেশি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাগত যোগ্যতার অধিকারী। এই যদি হয় আমাদের গাড়ি চালকেদের হাল হকিকত তাহলে কীভাবে আমরা নিরাপদ সড়কের প্রত্যাশা করব? আশ্চর্য জনক ব্যাপার হল আমি যে সব ড্রাইভারদের সমালোচনা করেছি তারা কিন্তু বড় বড় সার্টিফিকেটের অধিকারী। তবে তাদের কোন হিতাহিত জ্ঞান নেই। কারণ তারা এই সনদ গুলো মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে একটি প্রতিষ্ঠান থেকে সংগ্রহ করেছেন।এজন্য আমরা তাদের সার্টিফিকেটের কাছে কুপোকাত; বড় অসহায়। আমি মনে করি ঐ সব ভুয়া ড্রাইভারদের যত না বেশি অপরাধ তার চেয়ে বেশি অপরাধ ঐ সব প্রতিষ্ঠানের যারা প্রশিক্ষণ ছাড়া মোটা অঙ্কের বিনিময়ে তাদের হাতে তুলে দেয় একটি বড় সার্টিফিকেট। যার খেসারত দিতে হল মিরসরাইর অর্ধ শত শিশুকে। এক্ষেত্রে একটি উদাহরণ পেশ করা যেতে পরে- যদি কোন অন্ধের হাতে আলোর মশাল দিয়ে বলা হয় তুমি সমস্ত গ্রামকে আলোকিত করে আসো। তাহলে আলোকিত তো দুরের কথা গ্রামবাসীর ক্ষতির ভাগটাই হবে বেশি। প্রশিক্ষণ ছাড়া সার্টিফিকেট তুলে দেওয়া অন্ধের হাতে আলোর মশাল তুলে দেওয়ার নামান্তর। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে আরো বেশি দায়িত্ব সচেতন, সততা ও আন্তরিকতার পরিচয় দিতে হবে। আমাদের দেশে আইন আছে নামকাওয়াস্তে। কিন্তু বাস্তব প্রতিফলন না থাকায় মানুষ আইনের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে। যার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত মিরসরাইয়ের মর্মান্তিক কাহিনি। একটা প্রবাদ আছে – ‘কাজীর গরু খাতায় আছে, গোয়ালে নেই’। আমাদের দেশরে আইনও এমন। সুতরাং শুধু আইন প্রণয়নই নয়, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য দেশ পরিচালনায় নেতৃবৃন্দকে আরো বেশি যতœবান হতে হবে।

ইয়াছিন মাহমুদ