Bangla Newspapers
English Newspaper
আল-কায়েদা : লাদেন পরবর্তী বিশ্ব রাজনীতি কোন দিকে?
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর হঠাৎই বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্রে সন্ত্রাসী হামলার পর থেকে খুব দ্রুত বিশ্ব রাজনীতির পট পরিবর্তন হতে থাকে। কে বা কারা হামলা করেছে এর সঠিক তথ্য প্রমাণ না থাকলেও সব দোষ গিয়ে পড়ে আল-কায়েদা নেতা ওসামা বিন লাদেনের ওপর। ইয়ামেনি বাবার ৫৪ সন্তানের ২৭ তম সৌদি বংশদ্ভুত লাদেন সৌদিতে থাকেননি। ১৯৭৯ সালে সোভিয়েতের আফগানিস্থান দখল কৌশলগত কারণে পশ্চিমারা ভালভাবে নিতে পারেনি। তাই আফগান থেকে সোভিয়েতকে হটাতে পশ্চিমারা লাদেনকে যুক্তরাষ্ট্রে শিক্ষা ও সামরিক প্রশিক্ষণ প্রদান করে। পশ্চিমারাই অস্ত্র ও টাকা দিয়ে তাকে আফগানিস্থানে পাঠায় সোভিয়েতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য। লাদেনের নেতৃত্বে তালেবানদের প্রতিরোধে সোভিয়েত বাহিনী আফগান থেকে পালালে আল-কায়েদা গঠন করেন তিনি। ইরাক যুদ্ধ ও বিশ্বব্যাপী মুসলিমদের বিরুদ্ধে পশ্চিমাদের বিষোদগার লাদেনকে খেপিয়ে তোলে। ফলে লাদেন পশ্চিমাদের শায়েস্তা করার জন্য আল কায়েদাকে ব্যবহার করতে থাকেন। ১৯৯৩ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি নিউইয়র্কে বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্রের ভূগর্ভে শক্তিশালী বোমা হামলার মাধ্যমে আল-কায়েদা পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে তার আনুষ্ঠানিক হামলা শুরু করে। এর পর একে একে ১৯৯৫ সালের ১৩ নভেম্বর রিয়াদে গাড়ি বোমা হামলায় পাঁচ মার্কিন নাগরিক, ২৫ জুন ১৯৯৬ রিয়াদে ১৯ মার্কিন নাগরিক, ১৯৯৮ সালে নাইরোবিতে মার্কিন দূতাবাসে হামলার মাধ্যমে ২২৪ মার্কিন-আফ্রিকান নাগরিক, অক্টোবর ২০০০ সালে ইয়েমেনের পোর্ট এডেনে জাহাজে হামলায় ১৭ মার্কিন মেরিন সেনা ও ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্রে মার্কিন বিমান ছিনতাই করে টুইন টাওয়ারে বোমা হামলার মাধ্যমে তিন হাজার মানুষ নিহত হয়। যার বেশিরভাগই ছিল মার্কিন নাগরিক। এর পরই লাদেন-আলকায়েদা সহ বিশ্বে সকল সন্ত্রাসী সংগঠনের একটি তালিকা প্রস্তুত করে সিআইএ। লাদেনকে পাকড়াও করার উদ্দেশ্যে আফগানিস্থান আক্রমণ করে যুক্তরাষ্ট্র। লাদেনকে বিশ্বের এক নম্বর সন্ত্রাসী ঘোষণা দিয়ে তাকে জীবিত অথবা মৃত ধরিয়ে দিতে পারলে তিন কোটি ডলারের পুরস্কার ঘোষণা করে যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু অর্থলোভে লাদেনের কোন সহচর ইরাকি জেনারেলদের মত বিশ্বাস ঘাতকরা করেনি। বিশ্বের সর্ব সেরা প্রযুক্তিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে লাদেন গত দশটি বছর যুক্তরাষ্ট্রকে ঘোল খাইয়ে যাচ্ছিলেন। যদিও শেষ রক্ষা করতে পারেননি তিনি। পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদের ওয়াজিস্থানের ‘ওয়াজিস্থান ম্যানশন’ নামের বাড়িটিতে দুর্ধর্ষ অ্যাপাচি বীর যোদ্ধা জিরোনিমোর নামে অপারেশন ‘জিরোনিমো ইকিয়াতে” নিহত হন লাদেন। কিন্তু বিশ্লেষকদের মতে রাষ্ট্র বনাম ব্যক্তি যুদ্ধে লাদেনই জিতেছেন। লাদেন হত্যার পর তালেবানের পাকিস্তানি মুখপাত্র আহসানউল্লাহ আহসান বলেছেন “লাদেনকে হত্যা করে যুক্তরাষ্ট্রের এত উল্লসিত হওয়ার কিছু নেই। আমরা মাত্র তিন মাসের পরিকল্পনায় বেনজির ভুট্টোকে হত্যা করেছি অথচ লাদেনকে হত্যা করতে যুক্তরাষ্ট্রের ১০ বছর লেগেছে।” তিনি লাদেন হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ারও দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।
লাদেনের মৃত্যুর পর ১২৮ লাখ কোটি ডলার (এ যাবৎ) ব্যয়ে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়ের সূচনা হয়েছে বলে ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ওবামা একে ন্যায় বিচার বলে ঘোষণা দিয়েছেন। এর সঙ্গে রাশিয়া সহ যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য মিত্র দেশ একে স্বাগত জানালেও ফিলিস্তিনী প্রধান মন্ত্রী ইসমাইল হানিয়া, শাভেজ, কাস্ত্রো বিচার বিহীন এ হত্যার নিন্দা জানিয়েছেন।
ধারাবাহিক এসব ঘটনার পরই প্রশ্ন জাগে আলকায়েদা নেতা ওসামা বিন লাদেনের মৃত্যুর পর আল কায়েদার ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা কীরূপ হবে? সংগঠনটি কি শেষ হয়ে যাবে? নাকি নতুন নেতৃত্বে আবার চাঙ্গা হয়ে উঠবে? এই প্রশ্নের জবাব খুঁজতে গিয়ে বিশ্লেষকরা নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র এখন থেকে অবশ্যই নতুন করে আল-কায়েদার প্রতিরোধ সংগ্রামের শিকার হবে। অবশ্য তেমনটিতো ২০০১ সালের ৭ অক্টোবরই বলে দিয়েছিলেন লাদেন, “আমি যদি নাও থাকি তবুও জিহাদ চলতেই থাকবে।”
নেতা ওসামাকে হত্যার পর সংগঠনটি শেষ পর্যন্ত ভেঙে পড়বে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে লন্ডনের সিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যপ্রাচ্য বিভাগের অধ্যাপক রোজমেরি হলিস এর মন্তব্য হচ্ছে, “ওসামার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে সংগঠনটি নি:শেষ হয়ে যাবে না, কারণ সারা বিশ্বে এ সংগঠনটি ছড়িয়ে পড়েছে। সংগঠনটি ২০০১ সালে টুইন টাওয়ার হামলার পর যেভাবে কাজ করত এখন সেভাবে কাজ করে না। সংগঠনটি ফ্র্যাঞ্চজের মত ছড়িয়ে পড়েছে সারা বিশ্বে। আল কায়েদার স্থানীয় শাখাগুলো নিজেদের ব্যাপারে নিজেরাই সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। এছাড়া আল-কায়েদার মতাদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে অনেক উগ্র গোষ্ঠী আল কায়েদায় নাম লেখাচ্ছে, যাদের স্থানীয় এজেন্ডাও রয়েছে। যেমন- আরব উপদ্বীপ ও আফ্রিকান দেশগুলোর জঙ্গি সংগঠনগুলো।
তবে পশ্চিমাদের জন্য আশঙ্কার বিষয় এটি যে ওসামা ছিল অনেকের কাছে বীর, প্রতিরোধের প্রতীক, অনেকেই তাকে আদর্শ বলে মানে। অতএব অনেকেই তার মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে চাইবে যা কোন ভাবেই হেলাফেলা করার বিষয় নয়। তবে সম্প্রতি শুধু মুসলিমরা নয় বরং অনেক ইউরোপিয়ানও আলকায়েদার সাথে জড়িয়ে পড়ছে। তার জোরালো প্রমাণ পাওয়া গেছে যুক্তরাষ্ট্রের তোলা স্যাটেলাইট ছবি গুলোতে। ছবিতে দেখা গেছে সাদা চামড়ার নাগরিকেরা পাক-আফগান সীমান্তের কাছে আল কায়েদার নিকট থেকে প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। মূলত নাইন ইলেভেনের পর শত শত ইউরোপীয় পাসপোর্টধারী নাগরিক পাকিস্থান যাচ্ছে যা চোখে পড়ার মত। এসব ঘটনা আরও জোরালো হয়েছে কিছুদিন আগে মরক্কোতে জনসমাগম স্থানে বোমা পাতার সময় পুলিশের হাতে তিন নাগরিক ধরা পড়লে। ঐ ঘটনার পর জার্মানি শিকার করেছে যে তাদের অন্তত ২০০ নাগরিক পাক-আফগান সীমান্তে আল-কায়েদার প্রশিক্ষণ নিয়েছে। যা আরও ভাবিয়ে তুলেছে পশ্চিমাদের। নাইন ইলেভেনের আগে হামবুর্গ ছাড়া ইউরোপের অন্য কোন দেশে আল কায়েদার কোন শাখা ছিল না কিন্তু বর্তমানে ইউরোপের প্রায় প্রতিটি দেশেই আল কায়েদার শাখার বিস্তার ঘটেছে। পশ্চিমা বিশ্লেষকেরা মনে করেন যে ওসামার বাড়িতে পাওয়া কম্পিউটারে আল-কায়েদা নেতাদের অনেক তথ্য পাওয়া যাবে এবং তার ভিত্তিতে অনেককে আটক করা সম্ভব হবে। কিন্তু তারপরও সংগঠনটি ভেঙে পড়বে না বলেই জোড় আভাস পাচ্ছেন বিশ্লেষকেরা। ঠিক যেমনটি ঘটেছে লেবাননের হিজবুল্লাহ দের ক্ষেত্রে, তারা ইসরাইলের সাথে যুদ্ধের পর আগের যে কোন সময়ের চেয়ে আরও বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠেছে।
তবে প্রশ্ন ছিল লাদেনের মৃত্যুর পর কে হবে আল-কায়েদার যোগ্য উত্তরসূরি? আইমান-আল জাওয়াহিরির নাম জোরেশোরে শোনা গেলেও মিশরের সাবেক সেনা কর্মকর্তা সাইফ আল আদেল সে প্রশ্নের উত্তর মিটিয়েছেন। কেননা এ ব্যাপারে অভিজ্ঞতার ঝুলি সমৃদ্ধ রয়েছে তার। আদেল ১৯৯৮ সালে কেনিয়া ও তাঞ্জানিয়ার মার্কিন দূতাবাসে হামলার মূল হোতা বলে অভিযোগ রয়েছে। সাইফ আল আদেল আল-কায়েদার সমর বিশেষজ্ঞ ও সমর প্রকৌশলী। সাইফ মিশরের প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাতের হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত বলে মনে করা হয়। আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষকেরা মনে করেন যে, সাইফ আল আদেলের হাতে খুব ভালই চলবে আল কায়েদা।
তবে এ বিষয়ে ভিন্নমত প্রকাশ করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. শামছুল আলম। তার মতে, “নাইন ইলেভেনের পরে সারা বিশ্বে মুসলিমরা প্রচণ্ড চাপের মধ্যে রয়েছে। শান্তির দেশ নামে পরিচিত নরওয়েতে সম্প্রতি সন্ত্রাসী হামলা মুসলিমদের আরও চাপ ও বিদ্বেষের মধ্যে ফেলে দিয়েছে এতে কোন সন্দেহ নেই। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে এখন মুসলিম অভিবাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনও গড়ে উঠছে। নাইটস টেম্পলার, ইংলিশ ডিফেন্স প্রচণ্ড মুসলিম বিদ্বেষী বলে পরিচিত রাজনৈতিক সংগঠন, যারা মুসলিম অভিবাসন বিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছে। কিন্তু সত্য হচ্ছে ইসলাম কখনো অশান্তিকে সমর্থন করে না। এতে কোন সন্ত্রাসী সংগঠনই মুসলিমদের সমর্থন পাবে না। লাদেন পরবর্তী আল-কায়েদার নেতৃত্বও অত শক্তিশালী হবে না এবং ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে বিলুপ্ত হবে সংগঠনটি।”
এখন প্রশ্ন হল লাদেন হত্যার ঘটনায় পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতিতে কি প্রভাব পড়বে? নিহত লাদেন ও নরওয়ে হামলার পর যেভাবে রাজনীতির পট পরিবর্তিত হয়েছে তার মধ্যে প্রথমত, লাদেনের মৃত্যুর সাথে সাথে নিশ্চয় যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শেষ হয়ে যাবে না। বরং যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসী মনোভাব আরও বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। লাদেনকে খুঁজতে যে পরিশ্রম করতে হয়েছে বর্তমান বিধ্বস্ত আল কায়েদা কে ঘায়েল করতে আর অত বেশি কাঠখড় পোড়াতে হবে না। অতএব যুক্তরাষ্ট্র হয়তো এখন ইরাক, আলজেরিয়া, আলবেনিয়াসহ অন্যান্য মুসলিম দেশ যেখানে আল-কায়েদার শক্ত ঘাঁটি রয়েছে সে দিকে মনোযোগ দেবে। এতে নতুন কোন মুসলিম দেশ যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমাদের আগ্রাসনের শিকার হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। দ্বিতীয়ত, অপারেশন জিরোনিমোর মাধ্যমে পাকিস্তানকে কিছু না জানিয়ে স্বাধীন সার্বভৌম দেশের রাডার ব্যবস্থা অচল করে দেশের অভ্যন্তরে অভিযান চালানোকে ভালভাবে নেয়নি পাকিস্তান। নিন্দা প্রস্তাব পাশ হয়েছে পাকিস্তানের পার্লামেন্টে। অপরদিকে লাদেনকে পাকিস্তান এতদিন আশ্রয় দিয়েছিল এমন ধারণার প্রেক্ষিতে পাকিস্তানকে অস্ত্র ও অর্থ সাহায্য বন্ধের ঘোষণায় পাক-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের অবনতি হয়েছে। এমনকি পাকিস্তান সন্ত্রাস বিরোধী যুদ্ধে আর সহায়তা না করার হুমকি দিয়েছে। উল্লেখ্য আফগান যুদ্ধের সব রসদ (অস্ত্র ও সামরিক যান ব্যতীত) পাকিস্তান থেকে যায় এবং এটি পাকিস্তান বন্ধ করে দিলে যুদ্ধের পরিস্থিতি নতুন দিকে মোড় নিতে পারে। তৃতীয়ত, দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশ বিশেষ করে পাকিস্তান, চীন ও ইরান কৌশলগত কারণে লাদেন হত্যার পর যুক্তরাষ্ট্র আফগানস্থান থেকে সৈন্য সরিয়ে নিক এটা চাচ্ছে। কিন্তু তা না হলে প্রতিবেশী দেশটিতে মার্কিন সেনা উপস্থিতি উক্ত দেশগুলোর জন্য সুখকর নয়। ফলে রাশিয়া, ইরান এবং বিশেষ করে চীন তাদের সামরিক শক্তি বাড়িয়ে যাচ্ছে। কেননা যুক্তরাষ্ট্রের একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী হিসাবে চীনের আবির্ভাব ঘটতে যাচ্ছে। এবং ভবিষ্যতে এই দুটি দেশের প্রতিযোগিতা সাবেক সোভিয়েত ও যুক্তরাষ্ট্র প্রতিযোগিতার পর্যায়ে পৌঁছতে বাধ্য। আর তাই হয়তো চীন বিমানবাহী রণতরি আমদানির পাশাপাশি নির্মাণের কাজেও হাত দিয়েছে। চতুর্থত, লাদেন নিহত হবার পর যুক্তরাষ্ট্রের সাথে পাকিস্তানের সম্পর্কের অবনতি হবার সুযোগে মনমোহন সিং আফগানস্থান সফর করেছেন। এখানে পাকিস্থানকে ছাপিয়ে আফগানের সাথে নতুন এবং টেকসই একটি সম্পর্ক গড়ে আফগানস্থানের রাজনীতিতে প্রভাব রেখে পাকিস্থানের আঞ্চলিক প্রভাব হ্রাসই এর উদ্দেশ্য তা সবাই জানে। এতে করে পাকিস্থান আরও ফুঁসছে। ফলে চীনের সাথে পাকিস্তানের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হবে এত সন্দেহ নেই। পঞ্চমত, দক্ষিণ চীন সাগরে মার্কিন মেরিন সেনা উপস্থিতির পাশাপাশি আফগানস্থানে সেনা সমাবেশ ও তাদের নিরাপত্তা আগের চেয়ে সহজ ও শক্তিশালী হবে। ফলে এখান থেকেই মধ্য এশিয়ার রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। ষষ্ঠত, যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের মতে পাকিস্থান যেহেতু সন্ত্রাস লালন করে তাই পাকিস্থানের পারমাণবিক অস্ত্র আইএইএ নিয়ন্ত্রণে নিক যাতে তা সন্ত্রাসীদের হাতে যেতে না পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের এমন প্রস্তাবের পর তীব্র প্রতিবাদ করেছে পাকিস্থান এবং এতে উভয়ের মধ্যে সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়েছে। সপ্তমত, বারাক ওবামা ২০০৯ সালে কায়রোতে যে ভাষণ দিয়েছিলেন তাতে মনে হয়েছিল মুসলিমদের সাথে নতুন একটি সম্পর্ক হতে যাচ্ছে মুসলিম বিশ্বের । কিন্তু লাদেন হত্যার পর থেকে কট্টর পন্থী মুসলিম শাসক এবং কট্টর পন্থীদের সাথে পশ্চিমাদের সম্পর্ক আরও খারাপের দিকে মোড় নিয়েছে। এতে মুসলিমদের আরও সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছে। সম্প্রতি নরওয়ের ঘটনা এই বক্তব্যকে আরও জোরালো করে। এতে বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা এরূপ ভুল বোঝাবুঝি বিশ্বব্যাপী আরও নতুন নতুন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডকে উৎসাহিত করবে। অষ্টমত, ভারত দীর্ঘদিন যাবৎ ন্যাটোর সদস্যপদ দাবি করে আসছিল। লাদেনকে পাকিস্তান থেকে পাকড়াও করার পর যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সুসম্পর্ক ও আফগান ইস্যুতে জোরালো ভূমিকা রেখে নিজেকে ন্যাটোর সদস্যপদ পাবার জন্য জোড় তদবির করার সুযোগ পেয়েছে ভারত। ভারতকে ন্যাটোর সদস্যপদ প্রদান চীন বা পাকিস্থান কখনোই মেনে নিতে চাইবে না। এতে এই অঞ্চলে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি হবে তাতে কোন সন্দেহ নেই। নবমত, ব্যাপক জনসমর্থন নিয়ে নির্বাচিত ওবামার জনপ্রিয়তা যখন ক্রমেই কমছিল এবং সর্বশেষ মন্দা পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যর্থ হওয়া, স্বাস্থ্য বিল এবং লিবিয়ায় নতুন আর একটি যুদ্ধে জড়িয়ে যাওয়াতে প্রচণ্ড সমালোচনার মুখে তখন লাদেনকে হত্যা মার্কিন জনগণের দৃষ্টি অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিয়েছে। সর্বশেষ ওবামাকে সমর্থনকারী লোকসংখ্যা ৬০ শতাংশ। এই হারানো ইমেজ পুনরুদ্ধার হয়তো আগামী নির্বাচনে ওবাকে দ্বিতীয় মেয়াদে রাষ্ট্রপতি হওয়ার সুযোগ করে দিতে পারে।
যাই হোক সারা বিশ্বে এখন লাদেন হত্যার খবর আলোচনার কেন্দ্র বিন্দুতে। কিন্তু একজন মানুষ যত বড় অপরাধীই হোক না কেন বিচার বহির্ভূত এমন হত্যাকাণ্ড কোনভাবেই সমর্থন করা যায় না, বিশেষত যখন লাদেনকে জীবিত ধরার সুযোগ ছিল। আর লাদেন হত্যার সাথে সাথে নাইন ইলেভেনের প্রকৃত প্রেক্ষাপট লাদেনের মুখে জানার সম্ভাবনাটুকুও শেষ হয়ে গেল। লাদেন এখন ইতিহাস। লাদেন বিহীন আলকায়েদা এবং সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতিতে কেমন হয় এখন তাই দেখার বিষয়।
আজাদ