Bangla Newspapers
English Newspaper
একজন সোনা বরুর গল্প
২১ সেপ্টেম্বর, ২০১১। বাংলাদেশের এক পল্লী এলাকায় ঘটে যায় মর্মান্তিক ট্রাজেডি, হৃদয় বিদারক এক ঘটনা। যা পরদিন পত্রিকার পাতায় প্রকাশিত হয়েছে। হয়তো কারো নজরে পড়েছে, কারো পড়েনি। প্রতিদিনের হাজারও সমস্যার সংবাদের মাঝে ছোট্ট এ সংবাদটির প্রতি অনেকের দৃষ্টি না পড়াটা স্বাভাবিক। কিন্তু ঘটনাটা একদম স্বাভাবিক ছিল না।
বরগুনার কেওড়া বুনিয়া ইউনিয়নের ছোট্ট গ্রাম জাতির তবকা পল্লী, এ গ্রামের ১০ বছর বয়সী সরল-রূপসি মেয়ে ফেরদৌসি আখতার। জসিম উদ্দিনের কবিতার মতই মিষ্টি মেয়েটি। পাকা ধানের মতো যার রূপ। এ বয়সেই নিজের গুণে-রূপে সবাইকে মুগ্ধ করে রাখে সে। সবাই আদর করে তাই তাকে ডাকে সোনাবরু। অর্থাৎ সোনার মত বরন।
বাবা কাশেম আলী দফাদার। রোগে ভুগতে ভুগতে প্রায় বিনা চিকিৎসায় মারা গেছেন অনেক আগেই। মা আকলিমা খাতুন। পরের বাড়িতে কাজ করে সংসার চালান। সোনা বরুর মুখে ভাত তুলে দিতে দিতে স্বপ্ন দেখেন। পিতার অভাব ঘোচানোর চেষ্টা করেন। সোনাবরুর স্কুল খরচ সহ যাবতীয় খরচ মেটানোর জন্য মা রাস্তা মেরামতের কাজও করেন।
স্কুলে সোনাবরু সব সময়ই প্রথম হয়। শিক্ষকগণ তার মেধার পরিচয় পেয়ে মুগ্ধ হন। সবাই উৎসাহ দেন পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়ার জন্য। ঘরে প্রচণ্ড অভাব, একবেলা খেলে অন্যবেলা উপোস করতে হয়। এ অবস্থায়ও সোনাবরু লেখা পড়া চালিয়ে যায়। অনাহার আর ক্ষুধার যন্ত্রণায় মাঝে মাঝেই বিদ্রোহী হয়ে ওঠে সোনাবরু। মাকে জিজ্ঞেস করে, মা-আমরা এত গরিব কেন? সবার বাবা আছে, আমার নেই কেন? মা সোনাবরুকে সান্ত্বনা দেন। সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখান। এভাবেই চলছিল সোনাবরুর সোনায় মুড়ানো দিন।
২১ সেপ্টেম্বর। সোনাবরুর সবচেয়ে আনন্দের দিন। আজ যে সোনা বরুর জন্মদিন। এছাড়াও আজ চতুর্থ শ্রেনীর দ্বিতীয় সাময়িক পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হবে। উত্তেজনায় রাতে সোনার ঠিকমতো ঘুম হয় না। এক দিকে জন্মদিনের আনন্দ, অন্য দিকে রেজাল্টের চিন্তা। তবে ঘুম না হওয়ার আরো একটি কারণ ছিল। রাতে সোনাবরু কিছু খায়নি। কারণ, ঘরে রান্না হয়নি, রান্নার কিছু নেই।
ঘুম হতে উঠে সোনাবরু মা কে ডাকে, কিন্তু পায় না। হাড়িতে কোন খাবার নেই। স্কুলের সময় হয়ে এল। না খেয়েই সোনাবরু স্কুলে যায়। দোকান থেকে অনেক বলে কয়ে জোগাড় করে একটি কেক। এ কেক কেটে বন্ধুদের নিয়ে জন্মদিন উদ্যাপন করে সে। এরই মধ্যে পরীক্ষার রেজাল্ট পায়। যথারীতি সে ফার্স্ট। কিন্তু এত আনন্দও সোনাবরুর পেট ভরতে পারেনি। ক্ষুধার যন্ত্রণায় সে বাড়ি ফেরে। কিন্তু হাঁড়ি শূন্য। মা এখনও নেই। অভিমানে ফুলে ওঠে ছোট্ট সোনাবরু। অশ্র“ধারা নামে শ্রাবণের ধারায়। একবার পিতার কথা মনে আসে, নিজেদের দারিদ্র্যের কথা ভাবে। তারপর আবার কাঁদে। কাঁদতে কাঁদতেই এক কঠিন সিদ্ধান্ত নেয় ছোট্ট অভিমানী সোনাবরু। এদিকে ঘরে কোন খাবার নেই দেখে কাক ডাকা ভোরে খাদ্যের সংগ্রহে ছুটে যান এদিক সেদিক। কিন্তু কোন খাদ্য জোগাড় করতে না পেরে ছুটে যান পাশের গ্রামে নিজের বাপের বাড়ি। ভাইয়ের সংসারের গৃহস্থালি কাজ শেষ করে চাল নিয়ে আসতে আসতে দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়। ত্রস্ত পায়ে বাড়ি ঢুকে দেখেন দরজা খোলা। ভিতরে প্রবেশ করতেই মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। সোনাবরুর নিথর দেহ শূন্যে ঝুলছে। গ্রামবাসীর আদরের সোনাবরু আত্মহত্যা করেছে।
মা চিৎকার করে সোনাবরুকে ডাকেন। মেয়ের ঝাঁকড়া চুলের মাথা কোলে নিয়ে আহাজারি করেন। তার এ আহাজারি গ্রামবাসীর বুক ফাটায়, চোখে অশ্র“ ধারা নামায়। চারদিক প্রকম্পিত করে সর্বহারা এক মায়ের আকুল আহ্বান- ফিরে আয় মা, ফিরে আয়! কিন্তু সোনাবরু ফিরে না। কোন দিনে ফিরবে না। কারণ, এখন সে না ফেরার দেশে আরামে ঘুমাচ্ছে।
এই হল সোনাবরুর সংক্ষিপ্ত মর্মান্তিক কাহিনি। যা গল্প উপন্যাসের কাহিনিকেও হার মানায়। সোনাবরু, অসম্ভব হৃদয়হীন স্বার্থপর এক রাষ্ট্রে জন্ম হয়েছিল তোর। এখানে ক্ষমতার দ্বন্দ্বে লিপ্ত রাষ্ট্র পরিচালকগণ। ক্ষমতার লোভের কাছে বিতাড়িত এখানে মানবতা বোধ, মনুষ্যত্ব। ক্ষমতাই এ সমাজের শেষ কথা। যেভাবেই হোক রাজত্বের সিংহাসনে স্থায়ী হওয়াই একমাত্র লক্ষ্য। এর মাঝে তোকে নিয়ে চিন্তা করার স্থান কোথায়, সোনাবরু?
স্বাধীনতার ৪০ বছর পর সোনাবরুরা মরছে ক্ষুধার যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেয়ে। ১৯৭১ সালে যারা জীবন দিয়ে এদেশকে স্বাধীন করেছিল তারাতো চেয়েছিল শোষণহীন সমাজ। যেখানে কেউ না খেয়ে মরবে না। এটাইতো ছিল মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা, মূল আদর্শ।
সোনাবরু, তুমি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে গেলে আমাদের ব্যর্থতা। মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ বলে বলে মুখে ফেনা তুলে ফেললেও আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা থেকে কত আলোকবর্ষ দূরে আছি তা তুমি স্পষ্ট করে গেলে। আর তাইতো আজ আমাদের বুকের উপর পুলিশের বুট। আমাদের ভাগ্য বিধাতাগণ রাজনীতির নোংরা চালে ব্যস্ত প্রতি মুহূর্ত। এজন্য এই রাজনীতি গলিত মৃতদেহেরে মতো দুর্গন্ধযুক্ত ও বিষাক্ত। এ রাজনীতিতে সব কিছুর স্থান আছে, শুধু স্থান নেই তোর মত সোনাবরুদের।
বোন সোনাবরু! তুই তো এখন স্বর্গে বসে আছিস। তুই কি একটু স্রষ্টাকে বলবি, হে স্রষ্টা! এ সোনার বাংলায় আজ বড় দুর্দিন! এখানে মানুষের মধ্যে নেই কোন মমত্ববোধ। ১৬কোটি মানুষের মধ্যে মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন। এখানকার আকাশ, বাতাস ভারী হয়ে আছে পাপে। স্বার্থপরতায় ছেয়ে আছে গোটা দেশ। স্রষ্টা! তুমি এদের সাহায্য কর। এ দেশটার জন্য একটা কিছু কর! একটু বলবি কি বোন সোনাবরু!…………
মাহবুব
mahbub39gp@gmail.com