জলবায়ু পরিবর্তন ও বিশ্ব রাজনীতি

জলবায়ু পরিবর্তন ও বিশ্ব রাজনীতি

বর্তমান বিশ্বে যে সকল বিষয় আলোড়ন সৃষ্টি করেছে তার মধ্যে অন্যতম হলো জলবায়ু পরিবর্তন। জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব সারা বিশ্বে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করছে। ধনী কিংবা গরিব সকল রাষ্ট্রই জলবায়ু পরিবর্তনের জালে বন্দি। এই জাল থেকে উদ্ধারের জন্য তাই চেষ্টা চলছে নতুন নতুন পথ সৃষ্টির। এই পথ গুলো সব একই চষধঃভড়ৎস- এ মিললেও প্রত্যক পথেই স্বাতন্ত্র্য বিদ্যমান। ফলে নতুন মাত্রা হিসেবে যুক্ত হয়েছে রাজনীতি। জলবায়ু পরিবর্তন কেন্দ্রিক রাজনীতি বর্তমান বিশ্ব রাজনীতির রূপ নিয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে বিশ্ব রাজনীতির রূপ রেখা আলোচনার পূর্বে আমরা জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কে কিছু আলোচনা করতে চাই।

জলবায়ু বলতে বোঝায় কোন এলাকার ২৫-৩০ বছরের আবহাওয়ার উপাদানগুলোর গড় অবস্থা। আর জলবায়ু পরিবর্তন হলো এই গড় অবস্থার পরিবর্তন। আবহাওয়ার উপাদানগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত, আদ্রতা, বায়ুপ্রবাহ ইত্যাদি। এই উপাদানগুলো আবার কতগুলো নিয়ামকের উপর নির্ভরশীল। এখানে বলে রাখা উচিত আবহাওয়া বলতে নির্দিষ্ট দিনের উপরোক্ত উপাদানগুলোর গড় অবস্থা। আবহাওয়ার উপাদানগুলোই জলবায়ুর উপাদান। তাহলে আমরা বলতে পারি জলবায়ু পরিবর্তন বলতে বোঝায় জলবায়ুর উপাদানগুলোর পরিবর্তন।
জলবায়ুর পরিবর্তন আবহাওয়ার ধরন, বৃষ্টিপাত এবং পানি চক্রের প্রভাব সৃষ্টির পাশাপাশি ভূ-পৃষ্ঠে পানির প্রাচুর্য, মাটির আদ্রতা, ভূ-গর্ভস্থ পানির অবস্থার উপর বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করছে।
ওচঈঈ- এর এক গবেষণায় বলা হয়েছে ১৯০১ থেকে ২০০২ সালে মধ্যে উত্তর মেরুতে প্রায় ৭% বরফ কমে গেছে যেটা বসন্তকালে গলে যাওয়ার পরিমাণ ১৫%। আর এক গবেষণায় বলা হয়েছে উত্তর মেরুতে ১৯৭৯ এবং ২০০৫ সালের মধ্যে প্রায় -৬০ ২০ ১০৩ কস২ ণবধৎ-১ বরফ কমেছে।ওচঈঈ তার তৃতীয় মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলেছে সাগরের পানি আগের চেয়ে উষ্ণ হয়েছে। ১৯৬১ থেকে ২০০০ সালের মধ্যে সাগরের পানির উষ্ণতা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৭০০ মিটার গভীরতায় প্রায় ০.১০০ ঈ তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ভূ-স্থানিক বাস্তুতন্ত্র, মহাসাগরিক বাস্তুতন্ত্র, বাতাসের উপাদান, এরোসল উপাদানের পরিবর্তন সাধিত হয়েছে।
১৯৬১ সাল থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পেয়েছে প্রতিবছর গড়ে ১.৮ মিমি. যেখানে ১৯৯৩ সাল থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত বৃদ্ধির হার ছিল ৩.১ মিমি./বছর।
১৯০০ সাল থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার পূর্বাংশ, উত্তর ইউরোপ ও উত্তর এবং মধ্য এশিয়ার বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বেড়েছে। গত ৫০ বছরে তাপমাত্রার ব্যাপক পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। ঠান্ডা দিন, ঠান্ডা রাত এর তুলনায় গরম দিন ও গরম রাতের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
ওচঈঈ এবং অন্যান্য কয়েকটি প্রতিষ্ঠান মিলে গ্রীন হাউজ গ্যাস এবং তাপমাত্রা পরিবর্তনের উপর গবেষণার মাধ্যমে বিশ্ব উষ্ণায়ণের অবস্থা পর্যবেক্ষণ ও এ সম্পর্কিত প্রভাব ও জ্ঞান অর্জনের চেষ্টা করছে। বলা হচ্ছে জলবায়ু যদি ভবিষ্যৎ রূপ রেখা অনুযায়ী পরিবর্তিত হয় তা হলে আগামীতে ২.৮ বিলিয়ন মানুষ প্রত্যক্ষভাবে পানি সংকটে ভুগবে।
এখন আসি জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে বিশ্ব রাজনীতির পরিধি আলোচনায়। জলবায়ু পরিবর্তন মানুষ ও পরিবেশের সাথে যে নেতিবাচক সম্পর্ক সৃষ্টি করেছে বর্তমানে তা বিশ্ব রাজনীতির ইন্ধন জোগাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাওয়ায় ভুক্তভোগী দেশগুলো দায়ী দেশগুলোকে চাপ দিচ্ছে। দায়ী দেশগুলো অনেক টালবাহানা বা ‘পড়েছি মোগলের হাতে খানা খেতে হবে একসাথে’ ইত্যাদির মাধ্যমে অনেক ফাঁক ফোকর সৃষ্টির চেষ্টা চালাচ্ছে। কোন কোন ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণ দিতে স্বীকার করলেও তা হাত কেটে হাতের মূল্য দেওয়ার মত কিংবা নিজেকে দাতা দেশ সাজিয়ে ভুক্তভোগী দেশে প্রোজেক্ট খাটিয়ে নিজেদের সুনাম বজায় রাখার মানসিকতায়। তাছাড়া অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক রাজনীতিতে নিজেকে আড়াল করা কিংবা ভালো হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করছে। সমুদ্রের পানিতে ধনী দেশের জাহাজগুলো তেলসহ অন্যান্য ক্ষতিকারক পদার্থ ফেলার কারণে সমুদ্র দূষণসহ সমুদ্র উপকূলের পরিবেশ নষ্ট করার মাধ্যমে সমুদ্রের জলবায়ুর পরিবর্তন ঘটাচ্ছে। এর ফলে দরিদ্র দেশগুলোতে এ ইস্যু নিয়ে মিছিল মিটিং বা স্থানীয় দেশীয় রাজনীতির খোরাক সৃষ্টি হচ্ছে পাশাপাশি কিছু পরিবেশ আন্দোলন সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান নিজেদেরকে বিশ্ব রাজনীতির সাথে যুক্ত করছেন।
আমরা যদি বাংলাদেশের কথা চিন্তা করি তাহলে দেখি বিভিন্ন গবেষণায় বলা হচ্ছে উত্তরবঙ্গ মরুভূমি হওয়ার এবং দক্ষিণ বঙ্গ পানির নীচে তলিয়ে যাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা বিদ্যমান। বাংলাদেশ এ গবেষণা করার পর বসে নেই। দফায় দফায় ভারতের সাথে পানি চুক্তি নিয়ে কথা হচ্ছে, ওচঈঈ সম্মেলন, জাতিসংঘ সম্মেলন, তৃতীয় ও উন্নত বিশ্বে অনেকগুলো সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের কাছে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরছে। এ বিষয়গুলো লোকাল স্কেলে দুইটি দেশ বা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে পারস্পরিক রাজনৈতিক অবস্থান চাঙ্গা করছে।
আমরা জানি কার্বন ডাই অক্সাইড, মিথেন গ্যাস, সি.এফ.সি গ্যাসসহ অন্যান্য যে গ্রীন হাউস গ্যাসগুলো আছে এগুলোর উৎস হল তৈজসপত্র তৈরি কারখানা, শক্তি উৎপাদনকারী শিল্প কারখানা, বাণিজ্যিক ও আবাসিক এলাকা এবং কৃষি। এখানে দেখা যায় শক্তি উৎপাদনকারী শিল্প কারখানা, বাণিজ্যিক ও তৈজসপত্র উৎপাদনকারী এলাকা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে উন্নত ও ধনী রাষ্ট্রে অবস্থিত এবং জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী। অপর পক্ষে কৃষিজ ভূমি বেশিরভাগ ক্ষেত্রে উন্নয়নশীল দেশে অবস্থিত যা মিথেনের আধার। ফলে উন্নত দেশগুলো একাই গ্রীন হাউস গ্যাস বৃদ্ধির দায়ভার স্বীকার করছে না এবং তাদের মধ্যে একটা সংঘর্ষ সৃষ্টি হচ্ছে। অর্থনৈতিক, সামরিক ও রাজনৈতিক কারণে উন্নত রাষ্ট্রগুলো তাদের শিল্প ও সংস্থা বজায় রাখার অপ কৌশল হিসেবে দরিদ্র দেশকে তাদের দেশের কার্বন উৎপাদন কারী বিভিন্ন শিল্প বন্ধের মাধ্যমে তাদের বিভিন্ন আর্থিক সহযোগিতার ঘোষণা করছে যা সূক্ষ্ম রাজনৈতিক ইচ্ছা পূরণেরই বহিঃপ্রকাশ। এক্ষেত্রে কার্বন বাজারের কথা অনায়াসেই বলা যায় ।
“ঘড়ৎঃয ঝড়ঁঃয উরধষড়ঁমব”, রিও ঘোষণা, বার্লিন দলিল, কিয়োটো প্রটোকল, মরক্কো ঘোষণা এগুলো সবই জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে সম্পর্কিত বিশ্ব রাজনৈতিক ঘোষণা। জলবায়ু পরিবর্তন ও এ সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয় আলোচনা করার জন্য কতগুলো “ঘবমড়ঃরধঃরহম ইষড়পশং” এর সৃষ্টি করা হয়েছে। যার মধ্যে অন্যতম হল অহহবী-১, এবং ঘড়হ অহহবী-১, ৫টি আঞ্চলিক গ্র“প (আফ্রিকা, মধ্য ও পূর্ব ইউরোপ, ল্যাটিন আমেরিকা, ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জ এবং পশ্চিম ইউরোপ)। এছাড়া এ-৭৭, অঙঝওঝ, খউঈ, ঊট, টসনৎবষষধ, ঙচঊঈ, এগুলোও এর সাথে যুক্ত। সারা বিশ্বে কার্বন কমানোর জন্য ঈড়ৎব ঈধৎনড়হ এড়াবৎহধহপব গড়ফবষ, ঈৎড়ংং ঈঁঃঃরহম ঋড়ৎসধঃরড়হ, এষড়নধষ ঈধৎনড়হ জবমরসব ঝুংঃবস সৃষ্টি হচ্ছে, যা ধনী বিশ্ব ও দরিদ্র বিশ্বের মধ্যে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক চাপ ও বাধা সৃষ্টির মাধ্যমে নিজেদের মধ্যে অনেক উন্নয়নমূলক কাজে অনিচ্ছা, পক্ষপাতিত্ব এবং অসন্তোষ সৃষ্টি করছে।
Bali Action Plan এ গৃহীত REDD (Reducing Emission From Deforestation and Destructive Forest Practice) একটি রাজনৈতিক উদাহরণ যেখানে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে বনভূমি সংরক্ষণ ও সম্প্রসারণের মাধ্যমে ধনী দেশগুলো কার্বন সংরক্ষণ বা Carbon Stocks In Developing Countries এর মত কৌশলপত্র ঘোষণা করেছে। এছাড়া কতগুলো মডেল তৈরির কথা বলা হয়েছে। এসব মডেলে বলা হয়েছে উন্নয়নশীল এবং ক্রান্তীয় বৃষ্টিবহুল বনভূমি এলাকায় অবস্থিত দেশ সমূহ যে সকল বনভূমি উজাড় বা গাছ কাটছে এ থেকে তারা বিরত থাকবে এবং ধনী বা শিল্পোন্নত দেশগুলো এর জন্য এসব দেশকে অর্থ প্রদান করবে। সবচেয়ে মজার কথা হল UNFCC এর অধীনে কোপেন হেগেন সম্মেলনে Carbon Market অথবা Carbon Fund নামে প্রোগ্রাম হাতে নেয়া হয়েছে এবং এর অংশ হিসেবে Negotiating Blocks Aid Project, Carbon Credit Trading চালু হয়েছে। বর্তমানে উন্নত বিশ্বের কার্বন নির্গমন REDD পরিকল্পনা এবং এসব Market Fund এর উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে উন্নয়নশীল দেশগুলো।
২০০৯ সালে কোপেন হেগেনে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে বলা হয় শিল্পোন্নত রাষ্ট্রগুলো যে কার্বন নির্গমন করেছে তা আগামী ২০০ বছরের কার্বন নির্গমনের পরিমাণের চেয়েও বেশি। তাই তাদেরকে বৈশ্বিক উষ্ণতায় দায়ী করে উন্নয়নশীল দেশগুলো তাদেরকে কার্বন নির্গমন কমানোর জন্য চাপ দিচ্ছে। বর্তমানে চীন, ভারত, ব্রাজিল ইত্যাদি দেশে অর্থনৈতিক অবস্থা উন্নতির দিকে ধাবিত হওয়ায় আমেরিকা সহ অন্যান্য ধনী রাষ্ট্রগুলো মনে করে এসব দেশেরও কার্বন নির্গমন কমানো উচিত এবং এ সম্পর্কিত চুক্তি হওয়া দরকার।
উন্নয়নশীল দেশগুলোর দাবি “কিয়োটো প্রটোকল” বজায় থাকুক এবং শিল্পোন্নত রাষ্ট্রগুলো তাদের চুক্তি অনুযায়ী কার্বন নির্গমন ১৯৯০ লেভেলের মধ্যে রাখবে। বালি সম্মেলনে আমেরিকা সহ অন্যান্য দায়ী রাষ্ট্রগুলো জলবায়ু পরিবর্তনকে Planetary Emergency বলে ঘোষণা করে নিজেদের দোষ এড়িয়ে সবাইকে এর সমাধানে এগিয়ে আসতে আহ্বান করে। কিন্তু উন্নয়নশীল দেশসমূহের মুখপাত্র G-77 এবং  BASIC এর বিরোধিতা করে উন্নতদেশ সমূহকে দায়ী করে।
চীন বর্তমানে গ্রীন হাউস গ্যাস নির্গমনে আমেরিকাকে ছাড়িয়ে গেলেও তাদের দাবি উন্নত দেশ সমূহে মাত্র ২০% লোক বাস করে অথচ কার্বন নির্গমনে এ সব দেশ ৭০-৮০% দায়ী এবং চীন বলছে তারা আগামী ৫ বছরের মধ্যে কার্বন নির্গমন ২০% কমাবে এবং তাদের ধারণা আগামী ২০২০ সালের মধ্যে কার্বন লেভেল ২০০৫ এর হারে আনার পাশাপাশি কার্বন নির্গমন ৪০-৪৫% কমিয়ে আনবে।
জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে রাজনীতির সবচেয়ে মজার একটি উদাহরণ হল কোপেনহেগেন সম্মেলনে আফ্রিকার মুখপাত্রগণ আমেরিকা ও চীনকে Two Elephant in the Room বলে আখ্যায়িত করে এবং তাদেরকে ছাড় না দেওয়ার বিষয়ে জোরালো ঘোষণা দেয়।
পরিশেষে আমরা বলতে পারি জলবায়ু পরিবর্তন একক কোন ধারণা নয়। এটি একটি জটিল ও কঠিন বিষয়। ফলে জলবায়ু পরিবর্তন বুঝতে হলে অনেক দিন অপেক্ষা করতে হবে এবং কোন বিষয়টি জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত তা বোঝার এবং পদক্ষেপ গ্রহণ করার জন্য আজকে একটি বিষয় জলবায়ু পরিবর্তনের পক্ষে বা বিপক্ষে যাই হোক না কেন, এ নিয়ে যে রাজনীতি তা প্রতিনিয়ত রাজনীতির মাঠকে চাঙ্গা করবে। নতুন নতুন তথ্য উন্মোচন হচ্ছে যুক্ত হচ্ছে নতুন রাজনীতি।

মোঃ আনারুল হক মন্ডল

লেখক-শিক্ষার্থী, ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
ইমেইল: anarulju@gmail.com