ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা ও পরাশক্তির মুখোশ-

মাঝারি উচ্চতার একজন মানুষ, মায়াময় টলটলে যার চোখ, দেখে মনে হয় যেন এখনই কেঁদে ফেলবে। অথচ একটু ভালভাবে খেয়াল করলে দেখা যাবে কি ইস্পাত কঠিন দৃঢ়তা ঢাকা পড়ে আছে সহজ-সরল ভুবন ভোলানো হাসিতে। প্রোফাইল ছবিতে এক হাতে শান্তির প্রতীক জলপাই পাতা, অন্য হাতে একটি এ. কে-৪৭ রাইফেল, যুদ্ধ করে বাঁচার অঙ্গীকার। যিনি শুধু একটি স্বপ্নই দেখেছেন সারা জীবন। স্বাধীন ফিলিস্তিন। আমি ইয়াসির আরাফাতের কথাই বলছি । ফিলিস্তিন জাতি, বিশ্ব আজ তাকে বড় বেশি অনুভব করছে।
ইয়াসিরকে বিষ প্রয়োগে হত্যা করেছে ইসরাইল। তাতে তার স্বপ্নের মৃত্যু হয়নি। সে স্বপ্ন এগিয়ে নিয়ে গেছে ফিলিস্তিনি জনগণ, ফাতাহ, হামাস আরও অনেকে। পেছনে রয়েছে পৃথিবীর দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি দেশের সমর্থন, পুরো বিশ্বের ন্যায়পরায়ণ মানুষের ভালোবাসা। যে ভালোবাসা জুগিয়েছে সাহস, আর সে সাহসে অনুপ্রাণিত হয়ে ফিলিস্তিনের রাষ্ট্রপতি মাহমুদ আব্বাস গত ২৩ সেপ্টেম্বর শুক্রবার গ্রিনিচ মান সময় (জিএমটি) ১৫.৩৫-এ জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে স্বাধীন ফিলিস্তিন ও জাতিসংঘের সদস্যপদের আবেদন করেন। স্বীকৃতি পেতে সাধারণ পরিষদের ১২৯টি দেশের সমর্থন এবং নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী পাঁচটি রাষ্ট্রসহ কমপক্ষে নয়টি রাষ্ট্রের সমর্থন প্রয়োজন। কিন্তু দুঃখের বিষয় পৃথিবীর গণতন্ত্রের ফেরিওয়ালা, গত বিশ বছর ধরে ইসরাইল ফিলিস্তিন সমস্যার আলোচনার মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পরিচিত যুক্তরাষ্ট্র আগেই বলে দিয়েছে ফিলিস্তিনি স্বাধীনতা অথবা সদস্যপদ সংক্রান্ত যে কোন ইস্যুতে তারা ভেটো দেবে। অথচ গত বছর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনেই ওবামা বলেছিলেন আগামী এক বছরের মধ্যে ফিলিস্তিনিরা জাতিসংঘের সদস্য দেখতে চান। এক বছরের মধ্যে হঠাৎ ওবামার সুর পালটে গেল কেন? এ প্রশ্নটি মনে আসাই স্বাভাবিক। এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমাদের কয়েকটি স্বার্থ উন্মোচিত হয়ে পড়ে। এগুলোর মধ্যে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হল, প্রথমত, ২০১২ সালেই যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। নির্বাচনে ওবামা দ্বিতীয় বারের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। তাই তিনি ২০১২ সালের নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত ৭০ লাখ ইহুদির সমর্থন চাচ্ছেন। কেননা ওবামার জন্য ইহুদি ভোট ব্যাংক একটি বড় বিষয়। গত নির্বাচনে ইহুদি ভোটের শতকরা ৭৮ শতাংশ পেয়েছিলেন ওবামা। অবশ্য ইহুদিরা এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন রাজ্যে বড় বড় বিল বোর্ডের মাধ্যমে সতর্ক করে দিয়ে বিজ্ঞাপন দিয়েছে যে ‘ইসরাইলিদেরকে বাসের নিচে ফেলে দেওয়ার চিন্তা ভুলেও করবেন না।’ অতএব যুক্তরাষ্ট্রের সত্তর লাখ ইহুদি ভোটারকে ওবামা প্রশাসন ভয় পাওয়ার যথেষ্ট যৌক্তিকতা রয়েছে। দ্বিতীয়ত, একথা নিশ্চিত করে বলা যায় যে ফিলিস্তিনের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও ভূখণ্ডগত সামরিক গুরুত্ব অপরিসীম। কেননা এই রাষ্ট্রটি তিনটি মহাদেশের সংযোগ স্থল।  এখান থেকে মধ্য প্রাচ্য তথা এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপকে খুব সহজেই নজরে রাখা যায়। ফিলিস্তিন যদি রাষ্ট্র হিসাবে স্বীকৃতি পায় তবে নজরদারি বিশেষত খবরদারি কমে যাবে। এজন্য যুক্তরাষ্ট্র মূলত ইসরাইলকে তার ঘাঁটি হিসাবে ব্যবহারের জন্য এ সমস্যা টিকিয়ে রেখে নাক গলানোর সুযোগ চায়। সমস্যার সমাধান হয়ে গেলে যা সম্ভব হবে না। আর এজন্যই সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রপতি আইসেন হাওয়ার বলেছিলেন, “সামরিক দিক দিয়ে বিচার করলে মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ ভূখণ্ড আর নেই।” তৃতীয়ত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ইহুদি লবির জোর খুব বেশি, যতটা মুসলিম বিশ্বের কোন দেশেরই নেই। আর যুক্তরাষ্ট্রের ইহুদিরা শুধু লবিং এর ক্ষেত্রেই তোড়জোড় নয় বরং ব্যবসা-বাণিজ্য, মার্কিন প্রশাসন, শিল্প ইত্যাদি ক্ষেত্রে তারা মার্কিন পররাষ্ট্র নীতিতে অভ্যন্তরীণ উপাদান হিসাবে কাজ করে। অতএব ইহুদিদের চটালে এর ফলাফল সামাল দিতে ওবামা প্রশাসনকে বেশ বেগ পেতে হবে। চতুর্থত, মধ্যপ্রাচ্য মার্কিন অস্ত্র ব্যবসার প্রধান কেন্দ্র। ফিলিস্তিন সমস্যা আরও দীর্ঘতর হওয়া মানেই আরও দীর্ঘ দিন মধ্যপ্রাচ্যে তাদের অস্ত্র বাজার জমজমাট থাকবে। ফলে তারা প্রতিনিয়ত অর্থনৈতিক ভাবে লাভবান হতে থাকবে। পঞ্চমত, যুক্তরাষ্ট্রের এক নম্বর শত্র“ ইরান মধ্যপ্রাচ্যে শক্তিশালী হয়ে উঠলে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবে ভাটা পড়বে। মার্কিন বিভিন্ন তেল কোম্পানিকে পাততাড়ি গোটতে হবে। ফলে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ভাবে তা হবে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য চরম পরাজয়। এরই সুযোগে আঞ্চলিক শক্তি চীন বা রাশিয়া মাথাচাড়া দেবে ইরানের সাথে জোট করে এত সন্দেহ নেই। অতএব ইসরাইলকে সমর্থন দিয়ে এর স্বার্থ সংরক্ষিত করাই বুদ্ধির কাজ।
তবে একথা ঠিক যে ফিলিস্তিনিরা আগেই জানত যে জাতিসংঘে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র সংক্রান্ত যে কোন প্রস্তাবে ভেটো দেবে যুক্তরাষ্ট্র। কেননা এ বছর শুরুর দিকে যখন স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের প্রচারণায় নামে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ তখনই আকার ইঙ্গিতে তা বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছিল। যা বিশ্ব বিবেকের জানতে বাকি ছিল। এই প্রস্তাবের মাধ্যমে তাদের জানানো হল মধ্যস্থতা কারীর আসল রূপটি কেমন। সে হিসাবে যে কোন দিন (নিরাপত্তা পরিষদের ভোট গ্রহণের তারিখ ঠিক হয়নি) যুক্তরাষ্ট্রের এক ভেটোতেই স্বাধীন ফিলিস্তিনের আশা ধূলিসাৎ হয়ে গেলেও ইতোমধ্যেই তাদের ‘জনসংযোগ বিজয়’ হয়ে গেছে।
মাহমুদ আব্বাস যেদিন জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার প্রস্তাব উত্থাপন করেন সেদিন তিনি তার দেওয়া ভাষণে বলেন, ‘‘গত বিশ বছর ধরে চলতে থাকা শান্তি প্রক্রিয়া নিয়ে ফিলিস্তিন জাতি হতাশ হয়েই আজ জাতিসংঘের দ্বারস্থ হয়েছে। কারণ শান্তি প্রক্রিয়া শুধু প্রক্রিয়াতেই সীমাবদ্ধ ছিল।’’
ফিলিস্তিন স্বাধীনতা সংস্থা (পিএলও) ১৯৮৮ সালে আলজেরিয়ার রাজধানী আলজিয়ার্সে পিএলও’র জাতীয় পরিষদের এক অধিবেশনে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের ঘোষণা দিয়েছিল। এতে বলা হয় জর্দান নদীর পশ্চিম তীর, গাজা উপত্যকা ও জেরুজালেম নিয়ে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠিত হবে। অর্থাৎ ১৯৬৭ সালের আরব-ইসরাইল যুদ্ধ পূর্ব সীমানা অনুযায়ী ফিলিস্তিন গঠিত হবে। এই প্রস্তাব মেনে নিলে অধিকৃত অনেক জমি ইসরাইল ছেড়ে দিতে বাধ্য হবে, বোধ হয় এটাই ইসরাইলের জন্য ফিলিস্তিন রাষ্ট্র মেনে না নেওয়ার অন্যতম কারণ।
ফিলিস্তিনি স্বাধীনতা ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি তার ভাষণে বলেছেন, জাতিসংঘে ভোট দিয়ে নয় বরং ফিলিস্তিন গঠিত হবে ইসরাইলের সাথে আলোচনার মাধ্যমে। কারণ ইসরাইলের সম্মতি ছাড়া তা সম্ভব নয়। যুক্তরাষ্ট্রের এরূপ ভূমিকায় খেপেছে উদারপন্থী মার্কিনিরা এবং ডেমোক্রেট দল। অতি সম্প্রতি কংগ্রেসে ওবামার মধ্যপ্রাচ্য নীতির সমালোচনা করে কংগ্রেসের একটি বিশেষ নির্বাচনে বিপুল ব্যবধানে জিতেছেন বব টার্নার। এ ব্যাপারে নিউইয়র্কের সাবেক মেয়র ডেমোক্রেট নেতা এড কোচ বলেন, ‘‘বব টার্নারের এই বিজয় ওবামার জন্য এক বিশাল বার্তা যে, ইসরাইল নিয়ে তিনি যা করছেন এতে আমরা মোটেও খুশি নই।’’ বর্তমান সময়ের একটি জনমত জরিপ থেকে জানা গেছে, মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ে মার্কিন নাগরিকদের মাত্র ৩৯ শতাংশ ওবামাকে সমর্থন করেন। এতেই প্রমাণিত হয় যে, ওবামা যে মধ্যপ্রাচ্য ইস্যুতে ভুল পথে হাঁটছেন তা মার্কিন জনগণের নিকট এতদিনে পরিষ্কার হয়ে গেছে। তবে সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্য এবং ফিলিস্তিন ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের নীতির কঠোর সমালোচনা করেছেন কিউবার বিপ্লবী নেতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি ফিদেল কাস্ত্রো, ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রপতি হুগো শাভেজ, বলিভিয়ার রাষ্ট্রপতি ইভোমোরালেস সহ আরো অনেকে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন শেষ হওয়ার পর কাস্ত্রো একটি পত্রিকায় লেখা নিবন্ধের মাধ্যমে কঠোর সমালোচনা করে বলেন, “ফিলিস্তিন, লিবিয়া, ইরান ও মিশরসহ অন্যান্য রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ষড়যন্ত্র ও মিথ্যা অপপ্রচার করে বিশ্ববাসীর নিকট ভুলভাবে তুলে ধরছে। যা বিশ্ব শান্তি নষ্ট হবার অন্যতম কারণ।” কাস্ত্রো তার নিবন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি বারাক ওবামার দেওয়া ভাষণকে ‘অপ্রয়োজনীয় এবং অর্থহীন বকবকানি’ বলে উল্লেখ করেন। যুক্তরাষ্ট্রের একচোখা পররাষ্ট্রনীতি বুমেরাং হবে বলে তিনি মন্তব্য করেছেন। ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা এবং জাতিসংঘ সদস্যপদ প্রাপ্তির প্রকাশ্য বিরোধিতা সম্পর্কিত বিষয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. শামসুল আলম মনে করেন, ‘‘এই ঘটনার পর থেকে মুসলিম বিশ্বের সাথে আবারও সম্পর্কের অবনতি হবার সম্ভাবনা রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের। শুরু হতে পারে টানাপোড়েনের নতুন অধ্যায়। তবে একথা ঠিক যে ফিলিস্তিন ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকায় কয়েকটি মুসলিম দেশ বেশ বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছে, বিশেষ করে যে সব দেশের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের ভাল সম্পর্ক রয়েছে।’’
বারাক ওবামা যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবার এক বছরের মধ্যেই মধ্য প্রাচ্যের বেশ কয়েকটি মুসলিম দেশ সফর করেছিলেন। তিনি মিশর সফরে থাকা কালীন সময়ে ঐতিহাসিক ভাষণে (যা ইতোমধ্যে নাটক হিসাবে প্রমাণিত হয়েছে) বলেছিলেন, “ফিলিস্তিন সমস্যা সমাধানে যুক্তরাষ্ট্র অঙ্গীকারাবদ্ধ এবং স্বাধীন ও শান্তিময় ফিলিস্তিন দেখতে চায় যুক্তরাষ্ট্র ।” ১/১১ এর পর থেকে সারা পৃথিবীতে বিশেষ করে পশ্চিমা বিশ্বের সাথে মুসলমানদের যে টানাপোড়েন সম্পর্ক যাচ্ছিল, তার অনেকটাই নি®প্রভ হয়ে আসতে শুরু করে বারাক ওবামার এমন ভাষণে। তাছাড়া ওবামার পূর্ব পুরুষ ইসলাম ধর্মের অনুসারী, অতএব মুসলিম তথা ইসলাম ধর্মের অনুসারীদের প্রতি সহানুভূতি থাকবে এটাই স্বাভাবিক বলে ধরে নিয়েছিল মুসলিম বিশ্ব। আফগান যুদ্ধের মাধ্যমে লাদেন ও তালেবান পতন, ইরাক যুদ্ধের মাধ্যমে সাদ্দামকে উৎখাত, পশ্চিমা বিশ্বে ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের নিগৃহীত করা এবং ফিলিস্তিন ইস্যুতে ইসরাইলিদের একতরফা সমর্থন ইত্যাদির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র যে ঘৃণা কুড়িয়েছিল তা নিমিষেই গলে যায়। অনেকে তো আহ্লাদে আটখানা হয়ে ওবামার পুরো নাম বারাক হোসেন ওবামা বলেও ডাকতে শুরু করে।  কিন্তু ঘি মাখলেও যে কুরের লেজ সোজা হয় না তা আবারও প্রমাণিত হয়েছে। এবারে জাতিসংঘে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি এবং  জাতিসংঘের সদস্যপদ দাবির মাধ্যমেই পশ্চিমাদের মুখোশ খুলে গেছে। এরপর থেকে যুক্তরাষ্ট্র এই বলে গলাবাজি বা একতরফা রাজনীতি করতে পারবে না যে তারাই এই সমস্যা সমাধানের মধ্যস্থতাকারী। ওবামারা ভাষণের মধ্যে ইসরাইলের প্রতিচ্ছবি ও ইসরাইলি দখলদারিত্বের প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থনের মত লজ্জাহীনতা প্রকাশ পেয়েছে স্পষ্টভাবে। বিশ্ব, বিশেষত ফিলিস্তিনিরা যুক্তরাষ্ট্রকে আর মধ্যস্থতাকারী হিসেবে মেনে নেবে না। অন্যদিকে রাজনৈতিক ভারসাম্য ধরে রাখতে যুক্তরাষ্ট্রের বদলে সেখানে যুক্ত হবে রাশিয়া চীন বা প্রভাবশালী কোন রাষ্ট্র।
এবার হয়তো স্বাধীনতার স্বীকৃতি  এবং সদস্যপদ পাওয়া হল না ফিলিস্তিনিদের, কিন্তু তারা  স্বীকৃতি পাওয়ার পথে একবারে কয়েক ধাপ এগিয়ে গেল এত কোন সন্দেহ নেই। এবার আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান দ্রুততর হবে বলেই সবার আশা । কেননা ভণ্ড মধ্যস্থতাকারীর চেহারা উন্মোচিত হয়েছে এটাই বা কম কীসে? আরব ও সমগ্র মুসলিম বিশ্বের সাথে এমনই ভণ্ডামি ও প্রতারণা করে বেলফোর ঘোষণার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা পায় আজকের ইসরাইল রাষ্ট্র । সেই থেকে পশ্চিমাদের গণতন্ত্র, মানবতাবাদ আর শান্তি প্রক্রিয়ার নাটক শুরু হয়ে আজও চলছে। কিন্তু বিশ্ববাসী শিক্ষা নেয়নি। তবে সবচেয়ে বেশি লজ্জা আরব বিশ্বের তথা সমগ্র মুসলিম জাহানের। মুসলিম বিশ্বের দেশগুলো চাপ প্রয়োগের অস্ত্র হিসাবে তেল ব্যবহার করতে পারত। যেমনটি করেছিল ১৯৭৯ সালে তাদের দাবি আদায়ের জন্য। অথচ আশ্চর্য লাগে যে, মুসলিম বিশ্ব ছোট খাট স্বার্থের জন্য বৃহৎ স্বার্থ ত্যাগ করে কীভাবে চুপ থাকে? সংকীর্ণ স্বার্থকে বড় করে দেখার কারণেই ১৯৬৭ সালের আরব ইসরাইল যুদ্ধে প্রথম দিকে জিতে থেকেও শেষ পর্যন্ত হারতে হয়েছে। আজ কয়েকটি আরব রাষ্ট্র ব্যতীত সকলেই লজ্জা পেয়েছে ফিলিস্তিনিদের ওপর অন্যায়, অত্যাচার, অবিচার দেখে। তাই হয়তো আজ থেকে ৬০ বছর আগে বিশ্ববাসী যে ওয়াদা করেছিল ফিলিস্তিনিদের কাছে তা পূরণের জন্যই ইতোমধ্যে স্বীকৃতির পাশাপাশি  ১২৫টি দেশ পশ্চিমা দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানানো সহ কূটনৈতিক চাপও অব্যাহত রেখেছে। কিন্তু লজ্জা নেই সৌদি সহ আরবের শাসকদের। তারা তাঁবেদারি করতেই পছন্দ করে। যুক্তরাষ্ট্রের তাঁবেদারি না করলে, তার প্রভুত্ব না মেনে নিলে ক্ষমতায় থাকা যাবে না, এটাই হয়তো সৌদি শেখদের নির্লজ্জতার বড় কারণ। ধিক্কার তাদের প্রতি। কেন তারা বুঝতে পারে না যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্ব তাদের স্বার্থ ব্যতীত একটি পা’ও হাটে না। লাদেন, সাদ্দাম, মোবারক, মোশাররফ সবাই যুক্তরাষ্ট্রেরই সৃষ্টি। যুক্তরাষ্ট্রের মদদেই তারা শক্তিশালী হয়েছে। কিন্তু  প্রয়োজন শেষ হবার সাথে সাথেই তাদের ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া হয়েছে আঁস্তাকুড়ে। সৌদি আরবসহ অন্যান্য তাঁবেদার মুসলিম রাষ্ট্র প্রধানেরা এসব দেখে শিক্ষা নেননি। তারা জানতে চান না যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেন যার বন্ধু তার শত্র“র প্রয়োজন হয় না। তবুও তাঁবেদারিই তারা করবে। এমনটিই যেন সৃষ্টিকর্তার অমোঘ নিয়তি। তবে এমন তাঁবেদার, দালাল মুসলিম রাষ্ট্র থাকার চেয়ে না থাকাই উচিত ছিল এ কথা বলতে হয়তো ফিলিস্তিন সমর্থকেরা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবে।

আবু কালাম আজাদ
a.azadju@gmail.com
সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

-