বাংলাদেশকে নিয়ন্ত্রনে ইন্ডিয়া ডকট্রিন
বাংলাদেশকে নিয়ন্ত্রনে ইন্ডিয়া ডকট্রিন
মাহমুদুল হাসান
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির যে কোন আলোচনায় ভারতের প্রসঙ্গ অবশ্যই চলে আসে। ভূরাজনৈতিক কারনে বাংলাদেশ তিনদিক দিয়ে ভারত আবদ্ধ। এ দুই দেশের সম্পর্কে প্রচুর সমস্যা বিরাজমান। উত্তেজনার বিষয়সমূহ স্পষ্ট। সাধারণভাবে দেখা যায় বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রথম চার বছর ব্যতীত দেশ দুটির সম্পর্ক কখনোই আন্তরিক নয়। বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ন বিষয় হচ্ছে ভারতের সাথে অর্থপূর্ন নীতি নির্ধারনের জন্য একটি প্রারম্ভিক অবস্থা গঠনে সক্ষম ভারতের পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তা দৃষ্টিভঙ্গিও জনসাধারন্যে প্রচারের অভাব রয়েছে। তথাকথিত ইন্ডিয়া ডকট্রিন হল একটি বিষয় যা দক্ষিন এশিয়ায় আন্ত:রাষ্ট্র সম্পর্কে ব্যবহার হতে দেখা যায়।
একদিকে একটি বড় শক্তি হিসেবে ভারতের গুরুত্ব, অন্যদিকে বিশ্ব পরিসরে বড় ভূমিকা রাখতে এলিট দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে নয়াদিল্লীর পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তা নীতির ধরণ ও কার্যক্রম তৈরি হচ্ছে। আকার, জনসংখ্যা, অর্থনীতি ও সম্পদের পরিমান, শিল্প ও প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, কৌশলগত অবস্থান ও ঐতিহাসিক অতীত এসবই ভারতের শক্তির উৎস, যা একটি বৃহৎ শক্তির ভূমিকার আকাঙ্খী করে তোলে ভারতকে।
দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক অবস্থানে ভারতের বিশাল সর্বোৎকৃষ্ট অসম অবস্থানের বিষয়টি প্রতিবেশীরা মেনে নিতে বাধ্য এবং বিপরীতে কিছু করার মতো যথেষ্ট অবস্থানও নেই তাদের। ভারতের এ অবস্থান এর প্রতিবেশীদের জন্য সত্যিই একটি সমস্যা। সমস্যা দেখা যায় তখনই যখন কর্তৃত্বের জন্য এ অবস্থানকে ব্যবহার করা হয়। আঞ্চলিক কতৃত্বের জন্য ভারতের আকাঙ্খার প্রতিফলন দেখা যায় নয়াদিল্লীর প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তার ধারনা থেকে, যা ব্রিটিশ ভারতের উত্তরাধিকার হিসেবে বিবেচিত।
ভারতীয় শাসকদের কৌশলগত মতবাদে তিনটি স্তম্ভের উপর গুরুত্ব দেয়া হয়:
১.ভারতের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তের ভূখন্ডের নিরাপত্তা, যেখানে শক্তিশালী বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী ভারতের ভূখন্ডে সক্রিয় রয়েছে।
২.ভারতীয় উপমহাদেশের সমগ্র অঞ্চলে বিদেশী শক্তির নিয়ন্ত্রন প্রতিরোধ করা।
৩.ভারত মহাসাগর ও এর পারিপার্শ্বিক অবস্থানের নেতৃত্ব প্রদান।
নিরাপত্তার এই মহাদেশীয় ধারনায় বলা হয় এ পরিসীমায় কোন বাফার রাষ্ট্রের প্রতি হুমকীর অর্থ ভারতের প্রতি হুমকি। স্বাধীনতা উত্তর সময়ে বাস্তবতার বিপরীতে এই সমন্বিত ভারতীয় প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা কৌশল অতীত ভারতীয় ঔপনিবেশিক অহংকারের ঐতিহ্য হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। নেহেরুর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল একটি ইউনিয়ন বা স্বাধীন রাষ্ট্রগুলোর কনফেডারেশন যার একটি অভিন্ন প্রতিরক্ষা ও অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা থাকবে। দক্ষিন এশীয় প্রতিরক্ষা ও কৌশলগত ঐক্যের ক্ষেত্রে ভারতের ধারনা কার্যত ছোট দেশগুলোকে বাফার স্টেটের অবস্থান প্রদান করে।
এ অঞ্চলে ক্ষুদ্র প্রতিবেশীদের উপর ভারতের ভূখন্ডগত অলঙ্ঘনীয় স্বার্থ এভাবেই মনরো ডকট্রিনের ভারতীয় রুপ হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে। এটি নেহেরু কতৃক ঘোষিত হয়েছিল, সম্প্রসারিত হয়েছিল তার কন্যা ইন্দিরা গান্ধীর সময়ে এবং পরীক্ষা করা হয়েছিল রাজীব গান্ধীর মাধ্যমে। তাই এ ডকট্রিনকে ইন্ডিয়া ডকট্রিন, ইন্দিরা ডকট্রিন, রাজীব ডকট্রিন, দক্ষিণ এশীয় ডকট্রিন প্রভৃতি নামে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
মূল বিষয়টি হলো এ ডকট্রিনের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক কী? এর উত্তর দুই ভাবে আসতে পারে। প্রথমত, সংশ্লিষ্টতা সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের আকারে নেই। বাংলাদেশে কোন ধরনের সামরিক অভিযান শুরুর সম্ভাবনা নেই বললেই চলে বা ভারত বাংলাদেশে সর্ব উপায়ে সামরিক হস্তক্ষেপ এড়িয়ে চলায় আগ্রহী। ভারতের রনকৌশলবিদরা সম্পূর্ন সচেতন, তামিলদের সাথে তাদের হতাশাজনক অভিজ্ঞতা আছে। তাদের মতে, বাংলাদেশকে সামরিক লক্ষ্যবস্তু বানানো শ্রীলংকা, মালদ্বীপ বা এমনকি নেপালের তুলনায় খুবই চ্যালেঞ্জিং। তারপরও ভারতীয় সামরিক হস্তক্ষেপের বিষয়টি রনকৌশলবিদদের বিবেচনার বাইরে নেই।
দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, পরিবেশগত, কূটনৈতিক বা অন্যান্য দিক থেকে দুর্বল বাংলাদেশ ভারতের জন্য সুবিধাজনক। ইন্ডিয়া ডকট্রিনের উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য ভারত একদিকে বাংলাদেশকে দুর্বল করতে সম্ভাব্য সবকিছু করে এবং অন্যদিকে এগুলোর সর্বোৎকৃষ্ট ব্যবহার করে।
বাংলাদেশকে দুর্বল করতে ভারত অভ্যন্তরীন ও বহিঃস্থ এ দুই ধরনের মাধ্যমকে কাজে লাগাতে তৎপর। অভ্যন্তরীনভাবে বাংলাদেশকে দুর্বল করার মডেলে বৃহৎ জাতীয় ইস্যু সমূহের উপর মতবিরোধ এবং ফলস্বরুপ রাজনৈতিক সংকট ও অস্থিতিশীলতাকে তারা কাজে লাগাতে সচেষ্ট। এ সমস্যাগুলো জাতি গঠনের সমস্যার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। জাতিগঠন শব্দটির সম্পূর্ন অর্থে যা বুঝায় তা বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে অত্যন্ত সমস্যাপূর্ন। তৃতীয় বিশ্বের অন্যান্য অধিকাংশ উন্নয়নশীল দেশের চেয়ে ভিন্নভাবে আমরা জাতি হিসেবে বর্ণিত হয়েছি, বাংলাদেশ হল একটি পুরনো জাতির নতুন রাষ্ট্র।
বাংলাদেশের নৃতাত্বিক, ভাষাগত, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় ক্ষেত্রে সমগোত্রীয়তা ও অংশীদারিত্বমূলক অতীত ঐতিহ্য থাকার পরও জাতিগঠনের পথে অর্জন খুব সামান্যই হয়েছে। এ বিষয়টি এসে যায় যদি জাতিগঠনকে মানব সম্পর্ক, আচরন, কার্যক্রম ও সামাজিক প্রক্রিয়ার বৃহৎ পরিসরে ধারন করা হয়, এর মাধ্যমে জাতীয়তার চেতনার বিকাশ, সরকারের সাথে সাধারন ভূখন্ডগত কাঠামোয় রাজনৈতিক এককগুলোর ঐক্য, শাসক ও শাসিতের ঐক্য, নাগরিক ও বিভিন্ন সামাজিক গ্র“পের একটি সাধারন রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার ঐক্য এবং উদ্দেশ্যমূলক কার্যক্রমের জন্য ব্যক্তিগত পর্যায় থেকে প্রতিষ্ঠানগত ঐক্য। জাতীয় বিপ্লবের গৌরবময় ইতিহাস সমৃদ্ধ বাংলাদেশের মতো একটি দেশ যে জাতীয় পরিচিতির উপর কোনো বিতর্কে প্রবেশ করতে পারে তা ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরের পূর্বে কারও কল্পনায়ও ছিল না। তবে বাস্তবতা হচ্ছে ভিন্ন এবং ৪০ বছর পরও জাতীয় ঐক্যমত্যের চেষ্টা চলমান। দেশে বাঙ্গালী থেকে বাংলাদেশী পরিচিতি সেক্যুলার থেকে ইসলামপন্থীদের দিকে আন্দোলিত হয়েছে এবং দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রক্রিয়া উত্যক্ত হয়েছে।
রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও এর ফলে স্থানীয় রাষ্ট্রীয় দুর্বলতা রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানসমূহের অবস্থার অবনতি ঘটায়। সামাজিক গ্র“প ও শ্রেণীসমূহের মধ্যে তীব্র দলাদলি এবং দুই বিপরীত মতের মেরুপ্রবনতা, দারিদ্রতার মধ্যে সম্পদ ও ক্ষমতার অসম বন্টনের পদ্ধতি, সমগ্র সমাজে পৃষ্ঠপোষক-ক্রেতা সম্পর্ক ছড়িয়ে পড়ার ফলে প্রাতিষ্ঠানিক গুণ বর্জিত পদ্ধতি গড়ে ওঠে।
বহিঃস্থভাবে দুর্বল করার অন্যান্য দৃষ্টিভঙ্গি সাধারনভাবে তৃতীয় বিশ্বের দেশের মতো অভিন্ন, যেমন- আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিবেশ। অন্যান্য বিষয়ের সম্ভাবনা তো আছেই, যেমন- শস্যের ঘাটতি, বৈদেশিক সাহায্য না পাওয়া এবং একইভাবে রাজনৈতিক প্রভাব। অগ্রাধিকারের শর্তে ভারত ফ্যাক্টর বাংলাদেশের উপর বাইরের হুমকীর অবশিষ্ট উৎসগুলোকে ঢেকে ফেলেছে।
স্বাধীন বাংলাদেশের সাথে ভারতের আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল যখন ভারত-পাকিস্থান যুদ্ধ শুরুর ৩ দিন পর নতুন প্রজাতন্ত্র হিসেবে বাংলাদেশকে ভারত স্বীকৃতি দিয়েছিল। তবে প্রকৃতপক্ষে ঐ বছরের মার্চেই সম্পর্কের সূচনা হয়েছিল যখন বাংলাদেশের সাধারন জনগনের উপর অত্যাচার ও সন্ত্রাসের রাজত্ব চাপিয়ে দিয়েছিল তৎকালীন পাকিস্থানী সামরিক জান্তা। দেশ থেকে পালিয়ে যাওয়া লক্ষ লক্ষ শরনার্থীকে ভারতের সহায়তা ও সমর্থন, বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারকে সমর্থন, কূটনৈতিক সহযোগীতা ও সৈন্য সরবরাহ করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে সমর্থন একটি স্বীকৃত বিষয়। এ অঞ্চলে ভারতের দীর্ঘস্থায়ী কৌশলগত উদ্দেশ্য পূরনের কারনে বাংলাদেশের স্বাধীনতায় ভারতের সমর্থনের বিষয়টি তাৎপর্যপূর্ন হলেও সর্বদাই বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। অবশ্যই বাংলাদেশের জন্য এটি ছিল জাতীয় স্বাধীনতা ও টিকে থাকার ইস্যু। আর ভারতের জন্য এটি ছিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ও নিজ স্বার্থের সমন্বয়। এই অবস্থায় ভারত তার বৈরী প্রতিবেশী পাকিস্থানের আকার ছোট করতে এবং দক্ষিন এশিয়ায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী আঞ্চলিক শক্তিতে পরিনত হতে উপলক্ষ পেয়ে গিয়েছিল। এভাবে যখন পাকিস্থানের চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধের কারনে ভারতের মাটিতে লক্ষ লক্ষ শরনার্থী অবস্থান করছিল তখন ভারত ঐতিহাসিক এ সুযোগের সর্বোত্তম ব্যবহার করতে মুখিয়ে ছিল। এরুপ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ভারতের প্রতি বাংলাদেশের কৃতজ্ঞ মনোভাব বজায় ছিল। কিন্তু এটি ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিল কারন বাংলাদেশকে সহায়তার প্রতিদানে ভারত তার নিজের স্বার্থ গণনায়ই ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল। উপরোক্ত বাস্তবতার কারণে ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক উত্থান-পতন প্রক্রিয়ায় অগ্রসর হয়েছে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের অবস্থান থেকে দ্রুত পারস্পরিক সন্দেহ ও অবিশ্বাসের নিম্নবিন্দুতে পড়ে যায়। ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশের সরকারে বড় ধরনের পরিবর্তন ছিল একটি বিচার্যের বিষয়। তারপর ১৯৭৭ সালে ভারতে জনতা সরকারের ক্ষমতা লাভের ফলে সম্পর্কের উন্নতির ধারনা কিছুটা পৃথক সময় হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়। ১৯৮০ সালে ভারতের ক্ষমতায় ইন্দিরার কংগ্রেস ফিরে এলে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উন্নয়ন থমকে যায়। ১৯৯৬-২০০১ ও ২০১০ থেকে বর্তমান পর্যন্ত ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক বাহ্যিক ভাবে অনেক বন্ধুত্বপূর্ণ হিসেবে প্রচারণা পেলেও এ সম্পর্ক ভারতের তুলনায় বাংলাদেশকে খুব কমই লাভবান করেছে। সব সময়ই ভারত বেশি প্রাপ্তিতে উদ্যোগী হয়েছে।
[তাত্ত্বিক বিশ্লেষন Iftekharuzzaman এর প্রবন্ধ “The India Doctrine:Relevance for Bangladesh” অবলম্বনে সংযুক্ত হয়েছে।]
md.mhs_2011@yahoo.com



