বিদ্যমান উত্তরাধিকার আইনে নারী অধিকার: একটি পর্যালোচনা
বিদ্যমান উত্তরাধিকার আইনে নারী অধিকার: একটি পর্যালোচনা
মুসলিম আইন: একজন মুসলিম নারী বা পুরুষের মৃত্যুর পর মৃতের আনুষ্ঠানিকতা সম্প্রদানের খরচ, দেনা পরিশোধ, মৃত ব্যক্তি যদি কোন উইল সম্পাদন করে যান তবে তা হস্তান্তরের পর যে সম্পত্তি থাকবে তা উত্তরাধিকারীদের মধ্যে বণ্টন হবে। ওয়ারিশগণ তিন শ্রেণীতে বিভক্ত ক) কোরানিক অংশীদার খ) অবশিষ্ট অংশ ভোগী এবং গ) দুরবর্তী আতœীয়গণ।
ক) কোরানিক অংশীদার: এ অংশীদারদের তালিকা এবং স্ব স্ব অংশের পরিমাণ পবিত্র কোরআনের মাধ্যমে নির্ধারিত। তাদের চার জন পুরুষ, আর আটজন নারী। নারীরা হলেন: মা, পিতা বা মাতার মাতা, স্ত্রী, কন্যা, পুত্রের কন্যা, আপন বোন, বিমাতা বোন, বৈপিত্রেয় বোন। তাদের মধ্যে স্ত্রী, মাতা, কন্যা, এ তিনজন কখনো উত্তরাধিকার হতে বঞ্চিত হয় না।
খ) অবশিষ্ট অংশ ভোগী: মৃত ব্যক্তির সাথে যাদের রক্তের সম্পর্ক আছে এবং ধর্মীয় বিধানে নির্দিষ্ট অংশ অংশীদারদের বণ্টনের পর অবশিষ্ট সম্পত্তিতে যাদের অধিকার আছে তারাই অবশিষ্ট অংশ ভোগী।
গ) দূরবর্তী আত্মীয়: মৃত ব্যক্তির অংশীদার এবং অবশিষ্ট অংশ ভোগী না থাকলেই এরা সম্পত্তি পাবে।
অংশীদারদের বিবরণ: স্ত্রী স্বামীর সম্পত্তিতে দুই ভাবে অংশ পান। প্রথমত, যদি তাদের কোন সন্তানাদি না থাকে, তবে স্বামীর মোট সম্পত্তির ১/৪ অংশ পাবে। দ্বিতীয়ত, যদি স্বামীর সন্তান বা ছেলের সন্তান থাকে তবে স্ত্রী সম্পত্তির ১/৮ অংশ পাবে। যদি মৃত ব্যক্তির একাধিক স্ত্রী থাকে তাহলে তারা ১/৪ বা ১/৮ অংশ সমভাবে বণ্টন করে নেবে। মেয়ে কোন অবস্থাতেই পিতার সম্পত্তিতে সমগ্র অংশ পায় না। কন্যা ১/২ অংশ পাবে যদি সে মৃত ব্যক্তির একমাত্র কন্যা হয়, এবং একাধিক মেয়ে থাকলে মোট সম্পত্তি ২/৩ অংশ সমানভাবে পাবে। আর ভাই থাকলে বোন ভাইয়ের অর্ধেক অর্থাৎ ২:১ অংশ পাবে।
মৃত ব্যক্তির সন্তান বা পুত্রের সন্তান থাকলে বা ততোধিক ভাই বোন থাকলে মা ১/৬ অংশ পাবে, আর না থাকলে ১/৩ অংশ পাবে। মৃত ব্যক্তির স্বামী বা স্ত্রী, মাতা ও পিতা ওয়ারিশ হলে, স্বামী বা স্ত্রীর অংশ বাদে অবশিষ্ট সম্পত্তির ১/৩ অংশ মা পাবে।
নানি/দাদি (প্রকৃত মাতা মহী/ পিতা মহী) শর্তসাপেক্ষে ১/৬ অংশ করে পাবে, দাদি ও নানি উভয়ই সম্পত্তি লাভ করলে তারা একত্রে ১/৬ সমান ভাবে পাবে।
ধর্মীয় বিধি অনুসারে পুত্রের কন্যা/ পুত্রের পুত্রের কন্যা বা কোন নাবালক তার দাদা বা নানার সম্পত্তি পাবে না, যদি তার দাদা বা নানার পূর্বেই তার মা/ বাবা মারা যায়। তবে আশার কথা হলো, ১৯৬১ সালে প্রণীত মুসলিম পারিবারিক অধ্যাদেশের ৪নং ধারা অনুসারে নাবালক সন্তান তার দাদা / নানার সম্পত্তির ততটুকু পাবে যতটুকু তার মা/বাবা পেত।
একজন আপন বোন ১/২ অংশ এবং একাধিক আপন বোন একত্রে ২/৩ অংশ সমান ভাবে পাবে। আপন ভাইয়ের উপস্থিতিতে আপন বোন অবশিষ্ট অংশ ভোগী হিসাবে ২:১ হারে পাবে।
মৃত ব্যক্তির সন্তান, পুত্রের সন্তান যত নিম্নের হোক, পিতা অথবা পিতার পিতা, একাধিক আপন বোন কিংবা ভাইয়ের উপস্থিতিতে বৈমাত্রেয় বোন উত্তরাধিকার হতে বাদ পড়ে।
বৈপিত্রেয় বোনের অবস্থাও প্রায় একই। উপরোক্ত পর্যালোচনা থেকে আমরা দেখতে পাই যে, মাতা, স্ত্রী, বোন কেউই পিতা, স্বামী, ভাইয়ের সমান সম্পত্তি পায় না। মেয়ে সদস্যরা ছেলে সদস্যদের অর্ধেক পায়। এটা হচ্ছে আইনের দিক, কিন্তু বাস্তবে আমাদের সমাজে মেয়েদের অর্ধেক পাওনা টুকুও স্বীকার করা হয় না।
হিন্দু আইনে উত্তরাধিকার: হিন্দু আইন মূলত ২ ধরনের ক) মিতক্ষরা খ) দায়াভাগা আইন। বাংলাদেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের পারিবারিক বিষয় সমূহ যেমন: বিবাহ, উত্তরাধিকার, ভরন পোষণ, অবিভাকত্ব সম্পত্তি দান ইত্যাদি দায়াভাগা আইন মতে সম্পন্ন হয় থাকে। তাই আমরা দায়াভাগা অনুসারে উত্তরাধিকারটা দেখব। দায়াভাগা আইন মতে উত্তরাধিকারীদের ৩ ভাগে ভাগ করা হয়েছে। ক) সপিণ্ড খ) সকুল্য গ) সমানোদক। উক্ত তিন শ্রেণীর মধ্যে সপিণ্ডরা কেউ থাকলে সকুল্যরা সম্পত্তি পাবে না, আবার সকুল্যরা কেউ থাকলে সমানোদকরা সম্পত্তি পাবে না। এক্ষেত্রে সপিণ্ডদের সংখ্যা ৫৩ জন। ফলে সকুল্য ও সমানোদকরা সম্পত্তি পাওয়ার আশা না করাই ভাল। সপিণ্ড ৫৩ জনের মধ্যে নারী ৫ জন। এরা হল বিধবা স্ত্রী, কন্যা, মাতা, পিতামহী, প্রপিতামহী। এদের অবস্থান ৫৩ জনের মধ্যে যথাক্রমে ৪,৫,৮,১৪,২০ নম্বরে। সম্পত্তিতে হিন্দু নারীর অধিকার সংক্রান্ত আইন ১৯৩৭ পাশ হওয়ার পর বিধাবা এক বা একাধিক হলে, সকলে মিলে এক পুত্রের সমান অংশ সম্পত্তি জীবনসত্বে ভোগ দখল করতে পারবে। স্ত্রীর পরেই কন্যার দাবি। কন্যাদের প্রথমে অবিবাহিত কন্যা, এরপর ছেলে সন্তান আছে এমন কন্যারা জীবনসত্বে সম্পত্তি লাভ করবেন।
যে সকল কন্যাদের সন্তান নেই, যে সকল বিধবা কন্যাদের পুত্র সন্তান নেই, যে কন্যাদের শুধু মাত্র কন্যা সন্তান তারা সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হবে। হিন্দু নারীরা উত্তরাধিকার সূত্রে কয়েকটি ক্ষেত্রে সম্পত্তি পেলেও তা শুধু ভোগ করতে পারবে। কিন্তু বিক্রি, উইল, দান, স্বাধীনভাবে হস্তান্তর ইত্যাদি করতে পারবে না। শুধু মাত্র তিনি যার কাছ থেকে সম্পত্তি পেয়েছেন তার শ্রাদ্ধ ও অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সম্পত্তি বিক্রি করতে পারবেন। এখানে উল্লেখ করার প্রয়োজন, হিন্দু নারীরা স্ত্রীধন হিসাবেও সম্পত্তিতে অধিকার লাভ করেন। যেমন- কোন নারী উত্তরাধিকার ব্যতীত অন্য কোন সূত্র হতে সম্পত্তি লাভ করলে তাতে তিনি সম্পূর্ণ স্বত্বের অধিকারী হবেন। তিনি ওই সম্পত্তি যা ইচ্ছা তা করতে পারবেন। তা ছাড়া নারী নিজে উপার্জন করে সম্পত্তি অর্জন করলে তা স্ত্রীধন হিসাবে গণ্য হবে। আমরা এক্ষেত্রে দেখতে পাই হিন্দু নারীরা উত্তরাধিকারী হিসাবে চূড়ান্ত অর্থে সম্পত্তির মালিক হন না। যেটুকু মালিকানা পান তা হলো জীবনসত্বের অর্থাৎ ভোগ দখল করতে পারবেন কিন্তু বিক্রি, দান, হস্তান্তর করতে পারবেন না। এক্ষেত্রে শুধু মালিকানা নয়, হিন্দু সম্প্রদায়ের বিবাহ রেজিস্ট্রেশন ও বিবাহ বিচ্ছেদ আইন না থাকায় এখানেও নারীরা চরমভাবে বৈষম্যের শিকার। যদিও হিন্দু প্রধান দেশ ভারতের ধর্মীয় প্রথার অধিকাংশই বাতিল ও সংস্কার করা হয়েছে। আমাদের দেশে এই নিয়ে কোন মাথাব্যাথা নেই।
বৌদ্ধ ধর্মে উত্তরাধিকার: আমাদের দেশে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী জনগোষ্ঠী হিন্দু আইন অনুযায়ী তাদের উত্তরাধিকার নির্ধারণ করে থাকে।
সূত্র:
১। মুসলিম আইন: মনিরুজ্জামান
২। পবিত্র কোরআন শরিফ
৩। হিন্দু আইনের মূলনীতি: মোল্লা
৪। নারীর উন্নয়ননীতি মালা একটি পর্যালোচনা: সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরাম
৫। ল’ জার্নাল: চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
মোঃ তরিক উল্লাহ
লেখক: শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ (৩য় বর্ষ) চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।



