Bangla Newspapers
English Newspaper
গত কয়েক মাসে ইউরোপীয় ইউনিয়নের একাধিক দেশ ঋণ সংকটে পতিত হয়েছে, সেখানকার ছোট অর্থনীতির দেশ হিসেবে পরিচিত গ্রিস, পর্তুগাল, আয়ারল্যান্ডের অর্থনৈতিক অবস্থা উদ্বেগজনক। শুধু তাই নয়, ওই অঞ্চলের বড় অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে পরিচিত স্পেন, ইতালির মতো দেশগুলোর অবস্থাও সন্তোষজনক নয়। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অবস্থাও নেতিবাচক। চলতি বছরের দুই প্রান্তিকে (জানুয়ারি থেকে জুন) দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এক শতাংশেরও কম। বেকারত্বের হার ৯ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। বাজেট ঘাটতির অবস্থাও চরমে। মুডিসসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক রেটিং সংস্থার সুত্র অনুযায়ী, ১৯১৭ সালের পর এই প্রথম আমেরিকার ঋণ মানের সূচক ট্রিপল থেকে নেমে গেছে। ইউরোপ ও আমেরিকার অর্থনীতিতে মন্দা, পুঁজি বাজারে অস্থিরতা, ডলার ও ইউরোর মান কমে যাওয়া বিশ্ব অর্থনীতিকে অস্থির করে তুলেছে। এ অবস্থায় বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে বেছে নিচ্ছেন স্বর্ণকেই। এই অবস্থায় আন্তর্জাতিক বাজারেও লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে স্বর্ণের বাজার।
মূল্যবান ধাতু হিসেবে স্বর্ণের কদর আদিকাল থেকেই। প্রাচীন কালে রাজ্য দখলের সময় স্বর্ণকেই লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচনা করা হতো। কারণ তখনকার দিনে কোন রাজ্য কতটা আর্থিক ভাবে শক্তিশালী তার মানদণ্ড স্বর্ণ দ্বারাই নির্ধারণ করা হত। বিবেচনা করা হত যে, সে রাজ্যের কোষাগারে কি পরিমাণ মূল্যবান ধাতু সংরক্ষিত আছে। বর্তমান সময়ও এর ব্যতিক্রম নয়। বিশ্ব অর্থনীতির বিপর্যয়কর অবস্থায় ডলার ও ইউরোর উপর অনেকটা আস্থা হারিয়ে ফেলেছে উদীয়মান বাজার। ফলে স্বর্ণ সংগ্রহের দিকে নজর দিচ্ছে উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলো। স্থিতিশীল অর্থনীতির দেশগুলোর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে স্বর্ণের মজুদ বাড়াচ্ছে উদীয়মান বাজার অর্থনীতির দেশগুলোও। কারণ কোন দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতার বিষয়টি নির্ধারিত হয় সেই দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ সোনার পরিমাণের উপর।
আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম ১৮০০ ডলারের উপর। পাঁচ মাসের ব্যবধানে আউন্স প্রতি স্বর্ণের দাম বেড়েছে ৩৩ শতাংশ। ওয়ার্ল্ড গোল্ডেন কাউন্সিলের তথ্য অনুসারে, বিশ্ব বাজারে, ২০০৯ এর জানুয়ারিতে আউন্স প্রতি স্বর্ণের দাম ছিল-৮৮২ ডলার। ২০১০ এর জানুয়ারিতে দাম ছিল ১ হাজার ৯৬ ডলার। ২০১১ এর জানুয়ারিতে ছিল ১ হাজার ৪১৭ ডলার। সর্বশেষ বিশ্ব বাজারে ১৯ আগস্ট স্বর্ণের দাম বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৮৫০ ডলারে। এ নিয়ে চলতি বছর আন্তর্জাতিক বাজারে ধাতুটির দাম বেড়েছে ২০ দফা।
বিশ্ব বাজারের সাথে তাল মিলিয়ে অনেকটা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে দেশীয় বাজারে স্বর্ণের দাম। ফলে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ক্রয়সীমার মধ্যে নেই বাজার। আট মাসের ব্যবধানে বিশ্ব বাজারে স্বর্ণের দাম বেড়েছে আউন্স প্রতি ৩৬০ ডলারেরও বেশি। এর সঙ্গে তাল মিলিয়ে দাম বেড়েছে দেশীয় বাজারেও। বাংলাদেশ জুয়েলারি সমিতির তথ্য অনুসারে, জুলাইয়ের ৯ তারিখে দেশে ২২ ক্যারাটের স্বর্ণের প্রতি ভরির দাম বাড়ানো হয়েছে ১ হাজার ৭৫০ টাকা। দেশে ২০০৯ এর জানুয়ারিতে ভরি প্রতি স্বর্ণের দাম ছিল ২৫ হাজার টাকা। ২০১০ এর জানুয়ারিতে ভরি প্রতি স্বর্ণের দাম ছিল ৩২ হাজার টাকা। ২০১১ এর জানুয়ারিতে ভরি প্রতি স্বর্ণের দাম দাঁড়ায় ৪২ হাজার ১৬৫ টাকা। ২০১১ এর ৬ আগস্টে প্রতি ভরির দাম ছিল ৫২ হাজার ৫৯ টাকা। ১১ আগস্ট প্রতি ভরির দাম ছিল ৫৩ হাজার ৮২৯ টাকা। আর ১৯ আগস্ট দাম বাড়ানোর পর শেষ পর্যন্ত দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৭হাজার ৭৯৫ টাকা। অব্যাহতভাবে দাম বাড়ার কারণে বিপাকে পড়েছে দেশীয় স্বর্ণ ব্যবসায়ীরা, ক্রেতা কমে যাওয়ায় গহনার দোকানগুলোতে এখন আর আগের মতো বিক্রি নেই। দাম বাড়ার কারণে নিু ও মধ্যবিত্ত ক্রেতার সংখ্যা কমে যাওয়ায় উচ্চ বিত্ত কিছু ক্রেতাই এবারের ভরসা।
বৈদেশিক মুদ্রার একটি অংশ দিয়ে স্বর্ণ কিনে রাখে অনেক দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সাম্প্রতিক বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা ভাবের কারণে বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভে স্বর্ণের পরিমাণ বাড়াচ্ছে। গত বছরের এ সময়টাতে, বাংলাদেশ আইএমএফ এর কাছ থেকে দশ টন স্বর্ণ কিনেছে। আর প্রতিবেশী দেশ ভারত কিনেছে ২০০ টন। এ বছরও ভারত আইএমএফ থেকে স্বর্ণ কিনবে। কারণ যে দেশের স্বর্ণের রিজার্ভ যত বেশী সে দেশ অর্থনৈতিক ভাবে তত শক্তিশালী।
স্বর্ণের তদা আবারও বৃদ্ধি পাওয়ায় স্বল্পকালীন সময়ের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক আরো কিছু স্বর্ণ কিনতে পারে বলে মত দিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দীন আহমেদ এর মতে- অব্যাহতভাবে স্বর্ণের দাম বৃদ্ধির প্রভাব শীঘ্রই দেশের অর্থনীতিতে পড়বে।
বিশ্ব বাজারে স্বর্ণের দাম বেড়ে চলায় আপাত দৃষ্টিতে এ খাতে বিনিয়োগ লাভজনক মনে হলেও বিশেষজ্ঞদের মতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংককে এ বিষয়টি খুব সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। সিপিডি’র নির্বাহী পরিচালক অর্থনীতিবিদ মোস্তাফিজুর রহমান মনে করেন, স্বর্ণে বেশি বিনিয়োগ করতে গেলে ইতিমধ্যে চাপে থাকা বৈদেশিক লেনদেনের স্থিতি নতুন করে সংকটের মুখে পড়বে। তার মতে- কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচিত ডলারকে প্রাধান্য দিয়েই বিনিয়োগ পরিকল্পনা গ্রহণ করা। কারণ অভ্যন্তরীন মুদ্রা বাজারকে প্রভাবিত করতে ডলারের যথেষ্ট মজুদ থাকা জরুরি। তবে স্বল্প সময়ের জন্য সামান্য কিছু স্বর্ণ কিনে রাখার পক্ষেও মত দেন তিনি।
মাহবুবুল আলম