Bangla Newspapers
English Newspaper
মনমোহন সিং এর ঢাকা সফর প্রসঙ্গে বলতে গেলে প্রথমত আমাদের প্রত্যেককে একটি বিষয় ভাবতে হয়, কি চেয়েছি আর কি পেয়েছি? আমরা সবাই যখন সাভারের নবীনগরের জাতীয় স্মৃতিসৌধ পার হয়ে ঢাকা অভিমুখে যাত্রা করি, প্রায় প্রত্যেকের এটা ভেবে ভুল হয়েছে যেন ভারতের ভেতর দিয়ে চলছি। কোন নির্বাচনের মৌসুম চলছে। যেখানে প্রার্থী মনমোহন সিং। সুতরাং এই সাজ সজ্জাই প্রমাণ করে এই অশীতিপর বৃদ্ধকে আদর আপ্যায়নে বাংলাদেশিরা তাদের হাজার বছরের ঐতিহ্যকে ঠিকই ধরে রেখেছেন। কিন্তু এবার প্রশ্ন উঠে আমরা তো আমাদের সর্বস্ব দিয়ে সম্মান দেখিয়েছি, আপ্যায়ন করেছি, দুর্মূল্যের বাজারে কার্টুন কার্টুন রুপালি ইলিশ ঠিকই দিয়েছি, কিন্তু আমরা কি পেলাম? এই প্রশ্নের কোন উত্তর নেই।
মনমোহন সিং এর ঢাকা সফরের আগে অনেক বিশেষজ্ঞের মতো বিশিষ্ট কলামিস্ট ড. তারেক শামসুর রেহমান দৈনিক যুগান্তরের একটি উপ সম্পাদকীয়তে লিখেছিলেন “মনমোহনের ঢাকা সফর কতটা ফলপ্রসূ হবে”। স্যারের লেখাটি পড়ার পর একটা আশঙ্কা আমাদের মাঝে কাজ করছিল। কিন্তু একটা আশায় বুক বেঁধেছিলাম এই ভেবে যে, এ সরকার আর যাই হোক একটি নির্বাচিত সরকার। এরা তো আর ফখরুদ্দীন-মইনের মতো অনির্বাচিত অগণতান্ত্রিক সরকার নয়। তবে একটা বিষয় মনে রাখা দরকার ছিল যে, প্রকৃত অর্থে এ সরকারের পেছনে রয়েছেন কিছু অগণতান্ত্রিক আমলা। যাদের অনেকের বিগত চল্লিশ বছর দেশের সাথে রাখা সম্পর্কই প্রশ্নবিদ্ধ। তিস্তার পানি চুক্তি, ট্রানজিট, বিদ্যুত, বাণিজ্য ঘাটতি, নিরাপত্তা সহ নানা দিকে অনেক প্রত্যাশার মুলো ঝোলানো থাকলেও তা কতটুকু ভুল আর আমাদের ভাগ্যে কত বড় অশ্বডিম্ব তা মনমোহন সিং এর সফর শেষেই বোঝা গেল।
আমরা অবাক বিস্ময়ে লক্ষ্য করেছি। আমাদের দেশের পত্র-পত্রিকা বরাবরের মতো নির্লজ্জের চরম সাক্ষ্য দিয়ে যে মমতাকে কলকাতার দিদির বদলে নিজেদের দিদিই বানিয়ে ফেলতে ব্যাকুল ছিল। নিতান্ত চশমখোরের মতো সেই দিদি তার বিবেক বিসর্জন দিয়ে আমাদের দেশের মানুষকে শুকিয়ে মারার দৃঢ় সংকল্পে আবদ্ধ। তিনি মাত্র ২৫ ভাগ পানি আমাদের দিতে চান বাকিটুকু দেবেন না। তাই তিনি দাদা মনমোহনের সাথে আসার প্রয়োজনও বোধ করেননি। পাশাপাশি আরো এমন কিছু হটকারী চুক্তিও স্বাক্ষরিত হয়েছে যা নিয়ে জাতি আজও গভীর অন্ধকারে। আর ট্রানজিটের নামে ফ্রি করিডোর প্রাপ্তি এতো অনেকটাই নিশ্চিত করেছে ভারত। আমাদের মিডিয়া বার বার সাফাই গাইলেও দেশের আমজনতার আর বুঝতে বাকি নেই ট্রানজিটের আর ফ্রি করিডোরের পার্থক্য কত দুর। একটি দেশের মাঝ বরাবর চিরে রাস্তা তৈরি করে যদি পার্শ্ববর্তী কোন রাষ্ট্রের দুটি অঞ্চল একত্রিত করার সুযোগ দেয়া হয় সেটাকে আমরা ফ্রি করিডোর বলে ধরতে পারি। এক্ষেত্রে যদি জাতীয় স্বার্থে আপোশহীন নীতির প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হতো তবে মনমোহন সিং এর সফরের আলোচনার প্রথমেই আসার কথা ছিল তিস্তার পানি বণ্টনের প্রশ্নটি। ১৯৮৭ সালের পূর্ব পর্যন্ত তিস্তা নদীই ছিল উত্তরবঙ্গের প্রধান নদী। কিন্তু পানি বণ্টনের ব্যাপারে ভারতের একগুঁয়েমি, ঢিলেমি ও হটকারিতার ফলে তিস্তা এখন রুক্ষ হয়ে উঠেছে। তিস্তার বুক জুড়ে এখন শুষ্ক মৌসুমে কেবল বালু আর বালু। অন্যদিকে বর্ষাকালে মূল গতিপথ বদলে তিস্তা প্রচণ্ডভাবে আছড়ে পড়ে দুই তীরে। ফলে নির্দয় ভাঙনে ফি বছর ২০ হাজার মানুষ বাড়িঘর, গাছপালা, আবাদি জমি হারিয়ে পথের ভিখিরি হয়ে পড়ছে। ১৯৮৫ সালে তিস্তার উৎসমুখে এবং তিস্তা ব্যারেজ সেচ প্রকল্পের মাত্র ৬৫ কিলোমিটার উজানে ভারত গজলডোবা নামক স্থানে ব্যারেজ নির্মাণ করে। এর ফলে তিস্তা ব্যারেজ প্রকল্পটি এখন একরকম অকার্যকর। এ প্রকল্পের আওতায় রয়েছে ৭ লাখ ৫০ হাজার হেক্টর কৃষি জমি। তিস্তার শাখা নদীগুলো এখন পানিশূন্য। ৬৫ কিলোমিটার নদী ভরাট হয়ে গেছে এরই মধ্যে। তিস্তার পানি বণ্টনের ব্যাপারে অতীতে বাংলাদেশের প্রস্তাব ছিলÑ তিস্তা নদীর ৮০ ভাগ পানি সমানভাবে ভাগ হবে আর ২০ ভাগ রেখে দেয়া হবে নদীর জন্য। কিন্তু ভারত সে প্রস্তাব গ্রহণ না করে উল্টো তিস্তার কমান্ড এরিয়া তাদের বেশি, এ রকম দাবি তুলে বাংলাদেশ তিস্তার পানির সমান ভাগ পেতে পারে না বলে যুক্তি দেখিয়েছিল। ভারত তিস্তা ব্যারেজের সেচ এলাকা কমিয়ে দ্বিতীয় প্রকল্প বাতিল করার জন্য চাপ দিয়েছিল এবং সর্বশেষ এক চিঠিতে তিস্তার মাত্র ২০ ভাগ পানি ভাগাভাগি করার বিষয়টি জানিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু এত কিছুর পরেও কোন কার্যকর পদক্ষেপ এই সফর থেকে আমরা পাইনি। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অত্যন্ত ক্ষমতাবান উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমান সম্প্রতি নয়াদিল্লি সফর শেষ করে আমাদের জানিয়েছিলেন, তিস্তা নদীর ওপর ‘নির্ভরশীল জমি ও জনসংখ্যার ভিত্তিতে’ নদীর পানির ভাগাভাগি হবে। এর ব্যাখ্যা কী? আমরা কি তিস্তা নদীর ওপর নির্ভরশীল আমাদের জমি ও জনসংখ্যার সঠিক পরিসংখ্যান ভারতীয় পক্ষকে দিয়েছি? নাকি ভারত যে পরিসংখ্যান দিয়েছে, সেই পরিসংখ্যান আমরা গ্রহণ করে নিয়েছি? আমরা অত্যন্ত আশঙ্কার সাথে বলব আমরা হয়তো পরেরটিকেই সত্য বলে ধরে নিতে বাধ্য। ১৯৯৬ সালে আমরা গঙ্গার পানি চুক্তি করেছিলাম। কিন্তু চুক্তি অনুযায়ী আমরা পানি পাচ্ছি না। আজ পদ্মার তীর শুকিয়ে ধু ধু বালুচর। আর দেশের উত্তরাঞ্চল ধীরে ধীরে মরুকরণের পথে।
এই সফরে ফারাক্কার পানি বণ্টন দিয়ে আলোচনা হতে পারে বলে দেশবাসীকে একটা প্রত্যাশার বাণী শুনান হয়েছিল। কিন্তু অবাক করার বিষয় হচ্ছে তাও হয়নি।
জাতীয় স্বার্থে টিপাই মুখ নিয়ে আদৌ আলোচনার কোন সুযোগ থাকার কথা নয়। সবাইকে হাসির খোরাক জুটিয়ে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী আমাদের বললেন, ভারত এমন কিছু করবে না, যাতে বাংলাদেশের স্বার্থ ক্ষুণœ হয়। সম্প্রতি নর্থ ইস্টার্ন ইলেকট্রিক পাওয়ার কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান প্রেমচান্দ পংকজ তাঁর বিবরণে বুঝিয়ে দিয়েছেন আমাদের মাননীয় অতিথি মনমোহনদা আমাদের স্বার্থ কতটা দেখেছেন। পংকজ টিপাই মুখ বাঁধ নির্মাণের সত্যতা স্বীকার করেছেন। বাঁধটি নির্মিত হলে বৃহত্তর সিলেট অঞ্চল ক্ষতিগ্রস্ত হবে। গ্রীষ্মকালে ৯৪৬ কিলোমিটার এলাকা মরুভূমির ন্যায় শুকনো থাকবে। এই বিষয়টি যৌথ ইশতেহারে অনুপস্থিত থাকল কেন, তা আমাদের বোধগম্য নয়?
টিপাই মুখ বাঁধ আমাদের জাতির ভবিষ্যৎ অস্তিত্বের সাথে সম্পর্কিত হলেও এই বিষয়টিও মনমোহনের সফরে অস্পষ্টই থেকে গেছে। একদিকে গঙ্গার পানি প্রত্যাহারেই আমরা যখন শুকিয়ে মরতে বসেছি সেই সাথে সংবাদপত্রগুলো আমাদের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে ফেনী নদীর পানি প্রত্যাহার নিয়েও কথা আছে। ভারত ত্রিপুরার সাবরুমে সুপেয় পানির জন্য একটি শোধনাগার নির্মাণ করতে ফেনী নদী থেকে ১ দশমিক ৮২ কিউসেক পানি প্রত্যাহার করার অনুরোধ জানিয়েছিল। এখন শোনা যাচ্ছে ভারত সেচ কাজের জন্যও ফেনী নদীর পানি ব্যবহার করতে চায়। ফেনী নদীর পানি প্রত্যাহারের ফলে মুহুরি সেচ প্রকল্পের আওতাধীন চট্টগ্রাম ও ফেনী জেলার ইরি সেচ হুমকির মুখে পড়েছে। সরকারের উচিত ছিল এই বিষয়ে কিছুটা হলেও আলোকপাত করার চেষ্টা করা। কিন্তু আমাদের ভাগ্যে বরাবরের মতো একটি প্রত্যাশার মুলো ঝোলানো হয় যেটি মহমোহন সিং এর সফর শেষে সরিয়ে নিলে দেখেছি একটি অশ্বডিম্ব বাদে আর কিছুই অবশিষ্ট নেই।
ভারত থেকে ২৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ক্রয় সংক্রান্ত একটি চুক্তির কথা ছিল এই সফরে। কিন্তু এতে কি বাংলাদেশ খুব বেশি লাভবান হবে? আসলে অনেক আগেই আমাদের বোঝা উচিত ছিল ভারতের মতো একটি শক্তিশালী প্রতিবেশী দেশ জোন অফ প্রিভিলিজড ইন্টারেস্ট ভেবে কখনই এমন কোন চুক্তি কখনই করতে পারে না যেখানে আমাদের স্বার্থ সংরক্ষিত হবে। আমরা পত্রিকার খবর থেকে জেনেছি বিদ্যুৎ কিনতে ভারতের ন্যাশনাল থারমাল পাওয়ার কোম্পানিকে কমিশন বাবদ ইউনিট প্রতি ৪ পয়সা করে বছরে ৭ কোটি টাকা পরিশোধ করতে হবে। এটা মূলত লেফাফা দুরস্তি আর দালালি ‘ফি’। শুধু তাই নয়, ভারত সীমান্তের যত দূর থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ করবে বাংলাদেশকে তত বেশি সঞ্চালন ফি (হুইলিং চার্জ) দিতে হবে। ভারতে খুচরা পর্যায়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের মূল্য ২ রূপী। বাংলাদেশ এখন কত টাকায় বিদ্যুৎ কিনবে (প্রতি ইউনিট), তা স্পষ্ট নয়। কোন বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ আসবে, তাও আমরা জানি না। বিদ্যুৎ আমদানিতে কোন জটিলতা হলে, তা কোন আইনে হবে, কোথায় মীমাংসা হবে, তাও স্পষ্ট নয়। উপরন্তু ভারত থেকে বিদ্যুৎ আনতে আমাদের অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। সব মিলিয়ে বিদ্যুৎ আনতে আমাদের যে বিনিয়োগ, ওই বিনিয়োগ দিয়ে আমরা স্থানীয়ভাবেই বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারতাম। খুলনা এবং চট্টগ্রামে কয়লাভিত্তিক ১৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের জন্যও একটি চুক্তি হওয়ার কথা ছিল যা অনেকটা ধুরন্ধরতার সাথেই সফর শেষে আড়াল করা হয়েছে। এই ক্ষেত্রে কয়লা আসার কথা ভারত থেকে, যা অত্যন্ত নিকৃষ্ট মানের। দেশের আমজনতার একটি প্রশ্ন বার বার ফিরে ফিরে আসছে যেখানে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে প্রচুর কয়লার সন্ধান পাওয়া গেছে এবং তা উত্তোলিতও হচ্ছে, সেখানে কয়লানীতি প্রণয়ন না করে কেন আমদের ভারতীয় কয়লার ওপর নির্ভরশীল হতে হচ্ছে? আর যাই হোক এই লেফাফা দুরস্তির নির্ভরশীলতায় কখনও জাতীয় স্বার্থ যে রক্ষিত হতে পারে না সেটা আর নতুন করে বলার অবকাশ রাখে না।
প্রতিবছর আমরা দেখি বি এস এফ সীমান্তের পার্শ্ববর্তী মানুষকে পাখির মতো গুলি করে হত্যা করে চলেছে। কখনো বা তাদের পিটিয়ে লাশ বানিয়ে এদেশে পাঠিয়ে দেয়। কখনও বা তাদের গুলিতে প্রাণ দিতে হয় নিরীহ বাংলাদেশিদের। এই বি এস এফ এর তৈরি করা কাঁটাতারের বেড়ার মতই ভারত বাংলাদেশ সম্পর্ক নিরাপত্তা ও আনুষঙ্গিকতার বিচারে প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার কথা ছিল তা হয়নি। ফলে সীমান্তের কাঁটাতারে ঝুলন্ত কিশোরী ফেলানির লাশের সেই করুণ ছবি বাংলাদেশে ভারত তথাকথিত সুসম্পর্কেরই স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি বলে ধরে নিতে আমাদের আর কোন বাধা থাকছে না। তবে বরাবরের মতই আমাদের দেশের পদলেহী মিডিয়া বিষয়গুলোকে হাত করে শুধু একটি কল্পিত অবাস্তব বন্ধুত্বের স্বপ্নলোকের ছবি ছেপে দেশবাসীর চোখের সামনে একটি ধোঁয়াশার সৃষ্টি করেছে যা থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করাটাও দুরাশা।
আমাদের দেশের প্রচুর টিভি চ্যানেল। অনেকে মজা করে বলেন দর্শকের তুলনায় টিভির সংখ্যা বেশি। এগুলো বর্তমানে বিশ্ব মানের হওয়া সত্ত্বেও ভারতে প্রচার স্বত্ব পায়নি। অন্যদিকে কলকাতার গাধা মার্কা চ্যানেলগুলো দেখে এদেশের মানুষের বাংলা বলার ধরনই প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হয়ে চলেছে, এমনকি এদেশের সমাজ সংস্কৃতিও কলকাতার হাড়কিপটের আদলে গড়ে উঠতে শুরু করেছে। হয়তো একদিন বাঙালি তার হাজার বছরের ঐতিহ্যের মেহমানদারি ভুলে গিয়ে ভরদুপুরে কোন মেহমানকে বলে বসবে ‘ভাইয়া পুরো আদ্দেক শশা দিলাম, পুরোটাই খেয়ে নেবেন কিন্তু’। আমাদের দেশের শহরগুলোতে বাবা মা চাকুরিজীবী হওয়াতে বেশিরভাগ বাচ্চাকাচ্চা মানুষ হয় কাজের বুয়ার কাছে। আর এই সব কাজের বুয়াদের প্রথম পছন্দ ভারতে হিন্দি সিরিয়ালগুলো। আর নিরীহ অসহায় বাচ্চাগুলো এই কাজের বুয়াদের কাছে থেকে বাংলা ইংরেজি না শিখে শিখছে হিন্দি ভাষা। আর তাদের মেধা ও মননের বিকাশ এমন হচ্ছে যা তাদের গড়ে তুলছে একটি ভারতীয় বাংলাদেশি সংকর মনস্তত্ত্বের অধিকারী হিসেবে। আর আমাদের সরকার ও প্রশাসন তাদের চ্যানেল আমাদের দেশে লাগাতার প্রচারের সুযোগ করে দিয়ে এই সুযোগ আরো বর্ধিত করছে। এই সফরে ভারতে আমাদের দেশের চ্যানেল সম্প্রচার বিষয়ক আলোচনা হওয়াটা ছিল সময়ের দাবি, কিন্তু তা হয়নি।
আমরা দেখেছি ট্যারিফ, প্যারাট্যারিফের নামে অতিরিক্ত শুল্ক কমানের কোন উদ্যোগ ভারত কখনও নেয়নি। বাণিজ্য ঘাটতি একটি বড় বাধা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতির যে পরিমাণ, তার প্রায় অর্ধেক ভারতের সঙ্গে। ২০১০-১১ সালে এই ঘাটতির পরিমাণ ছিল ৩.৫০ বিলিয়ন ডলার, যা এর আগের বছরে ছিল ২.৯০ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ ঘাটতির পরিমাণ দিনে দিনে বাড়লেও, ঘাটতি কমানোর কোন উদ্যোগ নেই। পাশাপাশি আমাদের আপন বন্ধু ভারত দিনের পর দিন অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করে একের পর এক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেই চলেছে। যেমন বাংলাদেশের মেলামাইনের চাহিদা ভারতে থাকলেও বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের প্রায় ৩২ ভাগ শুল্ক পরিশোধ করতে হয়। ভারতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের কোটা প্রায় ৪০ লাখ পিছ থেকে বাড়িয়ে এক কোটিতে উন্নীত করলেও শুল্কের কারণে বাংলাদেশি পোশাক রফতানিকারকরা উৎসাহী হচ্ছেন না। সম্প্রতি ভারত বাংলাদেশ থেকে আমদানিকৃত সিমেন্টের ওপর অতিরিক্ত ১৮ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে। ভারত আগামী ৩ বছরের জন্য ১০ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ ২২৪টি পণ্য বাংলাদেশে রফতানি করার অনুমতি চেয়েছে। কিন্তু ভারতে বাংলাদেশি ৬১টি পণ্য শুল্ক মুক্ত ভাবে প্রবেশাধিকারের অনুমতি চেয়েছিল বাংলাদেশ। কিন্তু সেই অনুমতিও দেয়া হয়নি। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার বিধান অনুযায়ী ভারতে পণ্য রফতানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নানা ধরনের সুবিধা পাওয়ার কথা। তাছাড়া বাংলাদেশ সার্কভূক্ত দেশগুলোর মধ্যে স্বল্পোন্নত। এজন্যও ভারতের বাজারে বাংলাদেশের বিশেষ সুবিধা পাওয়ার কথা। কিন্তু ভারত সেই সুবিধা বাংলাদেশকে কখনোই দেয়নি। সবাইকে অবাক করে দিয়ে মনমোহনের সফরের সময় এই শুল্ক বাধা নিয়ে আদৌ কোন আলোচনাই হয়নি। যা এই সফরে বাংলাদেশের অর্জনকে একমাত্র অশ্বডিম্ব প্রদানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ করে ফেলেছে।
আমরা দেখেছি ভারতের প্রধানমন্ত্রী ঢাকায় আসার কথা ছিল উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোর ৫ জন মুখ্যমন্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে (মমতা ব্যানার্জি-পশ্চিমবঙ্গ, তরুণ গগৈ-আসাম, মানিক সরকার-ত্রিপুরা, মুকুল সাংমা-মেঘালয়, পু লালথান ওয়ালা-মিজোরাম)। এতে সফরের পূর্বেই বোঝা গেছে ভারতের স্বার্থ কোথায়। ভারত বাংলাদেশকে সঙ্গে নিয়ে একটি উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতা গড়ে তুলতে চেয়েছিল যা অনেকাংশেই পণ্ড হয়েছে মমতা ব্যানার্জি সফরে না আসায়। কিন্তু তিনি যে কারণে আসেননি সেটা আরো চিন্তার বিষয়। এ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা যদি ডকট্রিন অফ নেসেসিটি হিসেবে আমাদের সরকারকে মনমোহন সিং এর সাথে ভারতকে অধিক সুবিধা প্রদানকারী চুক্তি ও সমঝোতা স্বাক্ষর করতে দেখে থাকি তবে তবে হতাশার বিষয় ছাড়া আর কিছুই হতে পারে না।
বিশেষজ্ঞদের কাছেও এই সফর নানাভাবে ব্যর্থ বলে প্রতীয়মান হয়েছে। তারা বলেছেন এই চুক্তির ফলে ভারতীয়দের লাভ হয়েছে। আমাদের তেমন কোন অর্জন নেই। চুক্তির নামে বাংলাদেশ যা পেয়েছে তা তেমন কোন গুরুত্ব বহন করে না।
মনমোহনের সফলে বাংলাদেশের অর্জন
১. ৪৬ পণ্যের শুল্কমুক্ত সুবিধা
২. তিন বিঘা করিডোর ২৪ ঘণ্টা খোলার ব্যাপারে সম্মতি
৩. সীমান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির আশ্বাস
৪. ছিটমহল বিনিময়
৫. সুন্দরবন রক্ষার আশ্বাস
৬. রয়েল বেঙ্গল টাইগার রক্ষার ব্যবস্থা
৭. ঢাকা ও জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয় সহযোগিতা
৮. বিটিভি-দূরদর্শনের সহযোগিতা
৯. বিজিএমইএ’র ফ্যাশন টেকনোলজিকে দিল্লির ফ্যাশন টেকনোলজির সহযোগিতা
ভারতের অর্জন
১. বাংলাদেশি ইলিশ
২. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগিতা
৩. বিটিভির সহযোগিতা
৪. বিজিএমইএ’র ফ্যাশন টেকনোলজির সহযোগিতা
৫. করিডোর অনুমতি
৫. তিস্তার পানি চুক্তি না করা
৬. সহযোগিতা সমন্বিত রূপ রেখা
৭. ট্রানজিটের চুড়ান্ত সম্মতি আদায়।
মনমোহনের সফরে ভারত ও বাংলাদেশের অর্জন বিবেচনা করলে বাংলাদেশের নাগরিকদের জার পর নাই হতাশ হতে হয়।
মনমোহনের সফরের প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক ড. মনিরুজ্জামান মিঞা বলেছেন আমাদের প্রত্যাশা ছিল তিস্তা চুক্তি হবে। কিন্তু তা হয়নি। ছিটমহল সমস্যার সমাধান হলেও তা সম্পূর্ণ নয়। সীমান্ত হত্যা বিষয়ে এই সফরে জোড় আলোচনা হবার প্রয়োজন থাকলেও তা হয়নি যা হতাশাজনক।
রাষ্ট্র বিজ্ঞানী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক ড. এমাজ উদ্দীন আহমেদ বলেন, এই সফরে যে চুক্তি ও স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে তাতে বাংলাদেশ কিছুই পায়নি। এসব বিষয়ে সংসদে বা সংসদীয় কমিটিতে কোন আলোচনা করা হয়নি। প্রধানমন্ত্রী নিজে তার কয়েকজন অনির্বাচিত উপদেষ্টাকে নিয়ে এসব করেছেন। সমুদ্র সীমা নির্ধারণে কোন আলোচনা হয়নি।
সাংবাদিক ও কলামিষ্ট আতাউস সামাদ বলেছেন, ভারতের প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে যা হাবার তাই হয়েছে । আমি এত কোন রকম অবাক হইনি। কারণ ভারতের অভ্যাস হল বাংলাদেশ কে সব কিছু থেকে বঞ্চিত করা।
সমাজ চিন্তাবিদ ফরহাদ মজহার বলেছেন, ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সফরে কোন ম্যাজিক ছিল না। এরকম হবে তা একটু মনোযোগ দিলেই বোঝা যেত। কেননা ভারতের শাসক শ্রেণীর চরিত্র এরকম। স্বাধীনতা পরবর্তী সময় থেকেই ভারতের এই সুবিধাবাদিতা দেখা যাচ্ছে।
মোঃ আদনান আরিফ সালিম অর্ণব
সোহেলুর রহমান
aurnabmaas@gmail.com
nabokobi@gmail.com
শিক্ষার্থীবৃন্দ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
-