মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী নির্বাচন ও জনমত : বারাক ওবামার ভবিষ্যৎ
বর্তমান মার্কিন রাষ্ট্রপতি বারাক ওবামা ৪ নভেম্বর, ২০০৮ এর নির্বাচনে চড়ঢ়ঁষধৎ াড়ঃব (জনপ্রিয় ভোট) এর মাধ্যমে মার্কিন সরকার যন্ত্রের শীর্ষস্থানে অধিষ্ঠিত হন। তার নির্বাচনের স্লোগান ছিল ‘পরিবর্তন’ শিরোনাম কেন্দ্রিক। তিনি ২০১০ সালের শেষ নাগাদ ২০১২-১৩ সময়ে অনুষ্ঠিতব্য পরবর্তী নির্বাচনে অংশ নেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। ২০০৮ সালের নির্বাচনী ইশতিহারে ওবামা যে সকল আশ্বাস ও প্রতিশ্র“তি দিয়েছিলেন তার কতটুকু পূরণ করতে পেরেছেন আর কতটুকু পূরণ করতে পারেননি সে বিষয়ে পরিসংখ্যানগত হিসাব কষা শুরু করে দিয়েছেন মার্কিন ভোটারগণ। এই হিসাবের ধনাত্মক বা ঋণাত্মক সংখ্যা নির্ধারণ করবে ওবামার ভবিষ্যৎ। মার্কিন নির্বাচকমণ্ডলীর (ঊষবপঃড়ৎধঃব) মতামত বা জনমত চারটি বিষয়কে (অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক ইস্যু, নৃ তাত্ত্বিক ইস্যু, সামাজিক ইস্যু ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইস্যু) কে কেন্দ্র করে পরিবর্তিত ও প্রভাবিত হয়। এই চারটি ইস্যুর আলোকে ওবামার ভবিষ্যৎ আমেরিকার ভোটাররাই নির্ধারণ করবে। তবে উপরোক্ত ক্ষেত্রগুলো বিচার বিশ্লেষণ করলে ওবামার ভবিষ্যৎ বিষয়ে পূর্বাভাস দেয়া যায়। ওবামার পরবর্তী নির্বাচনের জন্য প্রধান চ্যালেঞ্জ হচ্ছে বিশ্ব মন্দা হতে মার্কিন অর্থনীতিকে উদ্ধার করা। মার্কিন অর্থনীতিতে অভ্যন্তরীণ ও বহিস্থ অর্থনৈতিক সমস্যাগুলো সমাধানের মাধ্যমে মারাত্মক অর্থনৈতিক বিপর্যয় থেকে মার্কিন জনগণকে রক্ষা করা ওবামার জন্য সবচেয়ে কঠিন দায়িত্ব ও পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় সাফল্য-ব্যর্থতার হার ওবামার নির্বাচন ভাগ্যের ৫০% নিয়ন্ত্রণ করছে। মার্কিন অর্থনীতি বহুবিধ কারণে মারাত্মক দুর্যোগে পতিত হয়েছে। অর্থনৈতিক এই দুর্দশার কারণে বেকারত্ব ও ঋণ খেলাপের সম্প্রসারণ ঘটাচ্ছে। মার্কিন দানব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো দেউলিয়া হয়ে মিনি বিড়ালে পরিণত হয়েছে। ঋণগ্রস্ত ও ঋণ খেলাপি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। মার্কিন অর্থনীতির এতই দৈন্যদশা যে তাকে তার প্রধান অর্থনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী চীনের নিকট ঞৎবংংধৎু ঈৎবফরঃ বিক্রি করতে ও বন্ধক রাখতে হচ্ছে।
বিশ্ব ক্রেডিট রেটিংয়ে যুক্তরাষ্ট্র শীর্ষস্থান হারিয়ে তৃতীয় স্থানে নেমে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ঋণের পরিমাণ ৬০০ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছাবে বলে আশঙ্কা করা হয়েছে। জনগণ মার্কিন প্রশাসনের বর্তমান নেতৃত্বের প্রতি আস্থা হারাতে বসেছে। ওবামা যদি বেকারত্বের এই মিছিল থামাতে সফল হন ও ঋণের পাহাড় কমিয়ে দেউলিয়াত্বের ঘূর্ণিঝড় রুখতে পারেন তাহলে তিনি তিমির আচ্ছন্ন সমুদ্রে বাতিঘরের দেখা পাবেন, যা হয়তো তার নির্বাচনী বৈতরণী পাড় করাবে। মার্কিন অভ্যন্তরীণ সংখ্যালঘু গোষ্ঠীগুলো এবং রাজনৈতিক নৃ তাত্ত্বিক বিভাজন সবসময় ঞযব ঋধপঃড়ৎ হিসেবে সক্রিয় ভূমিকা রাখে। ২০০৮ সালের নির্বাচন এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। ২০০৮ সালের নির্বাচনে কৃষ্ণাঙ্গ ওবামা মার্কিন মুল্লুকের কৃষ্ণাঙ্গ সম্প্রদায়ের আবেগ ঘন সমর্থন ও সংখ্যালঘু এশীয় সম্প্রদায়গুলোর প্রত্যাশী সমর্থন করায়াত্ত করতে সমর্থ হন। নির্বাচন পরবর্তী আফ্রিকা বাসীর স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয় যেমন- এইডসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ জোরদার, গৃহযুদ্ধের প্রাদুর্ভাব হ্রাস করা, মহামারি ও দুর্ভিক্ষ প্রতিরোধ করা ইত্যাদি বিষয়গুলোতে ওবামা প্রশাসন তেমন উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে সমর্থ হয়নি যা মার্কিন কৃষ্ণাঙ্গ সম্প্রদায়ের নিকট ওবামার পূর্বের আবেদন ও জনপ্রিয়তা বহুলাংশে হ্রাস করেছে। ৯/১১ পরবর্তী মার্কিন সমাজে মুসলিম ও বৃহৎ আঙ্গিকে এশীয় বিরোধী বর্ণবাদের ক্যান্সার সৃষ্টি হয়েছে, তার সম্প্রসারণ রোধ করতে ওবামা বেশ কিছু সিনেমাটিক পদক্ষেপ নিলেও কিঞ্চিৎ সাফল্যই অর্জন করতে পেরেছেন। ‘গ্রাউন্ড জিরোতে মসজিদ নির্মাণ’ কেন্দ্রিক চলমান দ্বন্দ্ব ও নিত্যনৈমিত্তিক ভাবে খণ্ড খণ্ড বর্ণবাদী দাঙ্গা ওবামার ব্যর্থতার জ্বলন্ত দুটি উদাহরণ। এই ব্যর্থতা হয়তো ওবামার ভোট ব্যাংককে দেউলিয়া করে দিতে পারে। তবে যুক্তির বিচারে বর্ণবাদের মত একটি বৃহত্তর সামাজিক সমস্যা নিরসনের জন্য চার বছর সামান্যই সময়। ৯/১১ দুর্ঘটনা মার্কিন জনগণের আবেগ ও বেদনার সাথে এত নিবিড় ভাবে সংশ্লিষ্ট যে এই ঘটনার সাথে সম্পর্কিত কোন বিষয়ই বিশেষ গুরুত্ব ও সাবধানতার সাথে পরিচর্চা করতে হবে। ওবামার জন্য চ্যালেঞ্জ স্বরূপ সামাজিক ইস্যু হল জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি ও জাতীয় জনকল্যাণ ব্যয়। এই দুইটি বিষয়ে মার্কিন ভোটাররা ছাড় দিতে মোটেও প্রস্তুত নয়। তাছাড়া বিশ্ব নিরাপত্তা ও শান্তি ব্যবস্থাপনার বিষয়টি মার্কিন ভোটারদের বহুলাংশে প্রভাবিত করে, কারণ বিষয়টি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা সার্বিকভাবে নিশ্চিত করার সাথে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। বিশ্ব নিরাপত্তা ও শান্তি রক্ষায় ওবামা দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ বলে বক্তব্য দিয়ে আসছেন ২০০৮ সালের প্রাক নির্বাচনী সভা হতে। ২০০৮ সালের নির্বাচনী প্রতিশ্র“তি অনুসারে ইরাক থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করলেও আফগানিস্থান হতে মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহার না করে সেখানে অতিরিক্ত মার্কিন সৈন্য নিয়োজিত করেছেন। বিশ্ব সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জর্জ ডব্লিউ বুশের পর দ্বিতীয় এবহবৎধষ ড়ভ ডধৎ ড়হ ঞবৎৎড়ৎ ওবামার সর্বোচ্চ সাফল্য গত জুলাই ২০১১ ওসামা বিন লাদেনকে পাকিস্থানে হত্যা করা। যদিও লাদেনের মৃত্যুতে আল কায়েদার কার্যক্রম ও শক্তি কতটুকু হ্রাস পেয়েছে ও বিশ্ব সন্ত্রাসবাদ কতটুকু অবদমিত হয়েছে তা নিয়ে ব্যাপক সন্দেহ আছে। বরং নরওয়েতে ব্রেইভিক নামক একজন খ্রিস্টান উগ্রপন্থী কর্তৃক ৮০ জন নিরস্ত্র মানুষ হত্যা ইঙ্গিত দিচ্ছে বিশ্ব সন্ত্রাসবাদ একটি নব্য ধারায় বিকশিত হচ্ছে। আরব অঞ্চলে মার্কিন স্বার্থ তেল ও ঈসরাইলের নিরাপত্তা দুটিই আজ অনিশ্চয়তার সম্মুখীন। তাই বিশ্ব রাজনীতিতে ওবামা কোন পথে হাঁটবেন তা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে মার্কিন ভোটারদের কাছে।
উপরোক্ত চারটি ইস্যু বারাক ওবামার ভাগ্যলিপি রচনা করবে পরবর্তী নির্বাচনে। এখন পর্যন্ত সাফল্য ব্যর্থতার পরিসংখ্যানের বিচারে হোয়াইট হাউসে দ্বিতীয় মেয়াদে বারাক ওবামার আগমনের বিষয়টি অনিশ্চিত ও অস্পষ্ট। ২০১২ সালের মাঝামাঝি নাগাদ বারাক ওবামার নিয়তির আকাশ স্পষ্টভাবে বোঝা যাবে।
মোঃ ফজলে রাব্বি
লেখক: শিক্ষার্থী, মাস্টার্স অধ্যয়নরত, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।



